১১:৫৯ এএম, ৮ এপ্রিল ২০২০, বুধবার | | ১৪ শা'বান ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

“অর্বাচীন আশা” ( ছোট গল্প )

০৩ মার্চ ২০২০, ০৯:২৭


             “অর্বাচীন আশা” ( ছোট গল্প )

              । ।  , আ, সালাম গফফার ছন্দ । । 

     বিকেলে বেড়াতে বের হয়েছি। উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ ঘোরা। সময় কাটতে চায়না।  নানান কাজের ঝামেলায় হাফিয়ে উঠেছি। সংসার সমরে যেন পেরে উঠছিনা। তাই অন্যমনস্ক ভাবে ঘুরতে এসেছি এলোমেলো ভাবে। ততক্ষণে স্কু্লের মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে এসেছি। বেশ ক’জন ছেলে মেয়ে বসে বসে গল্প-গুজব করছিল। আমাকে দেখামাত্র একজন উঠে দৌড়ে পালিয়ে যায় সেখান থেকে। চৌদ্দ-পনের বছর বয়সী একটি মেয়ে যেমনটি বসে ছিল তেমনটি বসে রইল। আমাকে দেখে সে একটু খানি নড়ে চড়ে বসে।  আমি তার অদূরে যেয়ে বসে পড়ি। তাকিয়ে দেখি ও আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে। ওর জড়তা কাটানোর জন্যে আমি মেয়েটিকে ইশারায় কাছে ডাকি। লজ্জা সঙ্কোচ নিয়ে কাছে এসে বলে,আমায় ডাকছেন?বলি,হ্যা,বসো। ও আমার পাশে বসে।  বললাম,তোমাদের বাসা কোথায়?ও মিচকি হেসে উত্তর দিলপলাশী। নামটা শুনতেই যেন মনটার মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে!মনের মাঝে প্রশ্ন জাগে। তাহলে কি সেই পলাশী!যে পলাশী’র প্রান্তরে লর্ড ক্লাইভের নবাবের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য ডুবে গিয়েছিল প্রায় দু’বছরের তরে। মন থেকে এ সব প্রশ্নের কোন উত্তর পাইনা তা হবে কেন!সে যাক। নামটা বলি,তুমি পড়া শুনা কর?‘হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয় ও আমার প্রশ্নের। মেয়েটি আরও জানাল’মধুপুর এসেছে বেড়াতে। আমাকে আসতে দেখে যে ছেলেটি দৌড়ে পালিয়েছিল,ইত্যবসরে তার নাম সোহেল। সে পুনরায় ফিরে এসেছে। সে অবাক হয়ে শুনছে আমার জেরা গুলি। ছেলেটি অসঙ্কোচে বলে বসে,আমার দুঃখের কাহিনী শুনবেন?-ইত্যাদি্‌ ইত্যাদি। আমি অবাক হই ওর কথা শুনে!আমাকে ও চেনে না,আমিও তাকে চিনি না। অথচ সে আমাকে‘ভাইয়া’বলে সম্বোধন করাতে আমিত রীতিমত অবাক!হতবাক!তবু তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বললাম,হ্যাঁ। বলো তোমার জীবন কাহিনি শুনব। অভয় পেয়ে ও বলতে শুরু করে,‘আমার নাম শান্ত। মা’বাবার চতুর্থ সন্তান আমি। আমার ছোট একটা বোন আছে। নাম তাঁর শান্তা। আমার বড় তিন ভাই লেখা-পড়া শিখেছেন মোটা মুটি। কেও এইট কেওবা নাইন পর্যন্ত। আমি সবার ছোট। তাই আদর পেতাম একটু বেশী। বাবা লেখা পড়া জানতেন কম। কোন রকমে নাম সই করতে পারতেন। তাইত বাবার প্রবল ইচ্ছে আমি লেখা পড়া শিখে অনেক বড় হই। সেই ভাবে আমি পড়া শুনা করতে থাকি। সংসারের কাজ কর্মে কাউকে কোন সাহায্য করতাম না। লেখা পড়া আর খেলা ধূলা এই ছিল আমার কাজ। গল্পের বই,কাব্য,উপন্যাস,ইতিহাস,ভূগোল,নাটক ও সাহিত্য প্রভৃতি বিষয় আমার খুব প্রিয়। জীবনে লেখা-পড়া শিখে আমাকে অনেক বড় হতে হবে এই আশা পোষণ করতাম মনে। কবি হব;লেখক সাহিত্যিক আরও কত কি!এ আশা মনের মধ্যে আমার সব সময় জাল বিস্তার করতে থাকে। পড়া শুনার ফাঁকে ফাঁকে একটু আধটু লিখতে অভ্যেস করতে থাকি,ছড়া,কবিতা,গল্প প্রভৃতি। প্রাথমিক পরীক্ষায় বৃত্তি পেলাম। চলে এলাম হাই স্কুলে। পড়াশুনার অবসরে স্বরচিত ছড়া,কবিতা,গান গুলো প্রকাশের জন্যে পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত পাঠাতে থাকি। এভাবে চলতে থাকে আমার লেখা পড়া আর সাহিত্য চর্চা। অবশেষে এলো ঊনিশ’শ সত্তর। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। একাত্তরে এস এস সি পরীক্ষার্থী। একাত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামের বান ডেকে এলো। ঝাঁপিয়ে পড়ি তাই স্বাধীনতা যুদ্ধে। স্বাধীনতা শেষে এস এস সি পাশ করে এলাম কলেজে। আনন্দ মুখর কলেজ জীবন। হঠাত একদিন আমার জীবনে এলো অমানিশার কালোছায়া!অকস্মাৎ বাবা মারা গেলেন। থমকে গেল আমার পড়াশুনা। ভেঙে গেল আমার সব স্বপ্নের সাধ-আহলাদ!মনে অনেক আশা ছিল লেখা পড়া শিখে বড় হব,অনেক-অনেক বড়। কিন্তু আমার সেই অর্বাচীন আশাকাংখা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল একেবারে। –এই পর্যন্ত বলে ছেলেটি থামল। দেখলাম ওর দু’চোখের কোণ জলে ভ’রে গেছে!কাহিনী শুনে আমি তাকে আর কিছু বলতে পারিনি। হতবাক মুকের মতো নির্বাক নয়নে চেয়ে রইলাম ছেলেটির মুখের পানে!