১০:২৬ এএম, ১২ জুলাই ২০২০, রোববার | | ২১ জ্বিলকদ ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

ঐ মুখুজ্যে বাবু আমার এমন সব্বনাশ করিচে

২৯ জানুয়ারী ২০২০, ০৮:২৮


লেখা : অন্তরা রায়

চ্যানেলে দেখে চমকে ওঠে শবরী | উনিশ বছরের টিয়া গত পাঁচ বছর ধরে এবাড়িতে কাজ করে এসেছে | সেই চেনা চুপচাপ মেয়েটা মিনমিনে স্বরে বলছে ,

-- বলতেছি তো , ঐ মুখুজ্যে বাবু আমার এমন সব্বনাশ করিচে |
পাশ থেকে টিয়ার মা জামাইবাবু চিৎকার করছে |
-- আমরা গরীব মানুষ বলে কি ঠিক বিচার পাবুনি ছ্যার ? মেয়েটার জেবনটা যে ছাই করে দেলো গো বাবু |

লজ্জায় মাথা মাটিতে মিশে যাচ্ছে শবরীর |এসব কি বলছে টিয়া ! নিজের কানকে যে বিশ্বাস করতে পারছেনা ও | 
প্রশান্তবাবু পুলিশ হেফাজতে | ছোট দেওর , জা খবরটা পেয়েই এবাড়িতে সেদিনই এসেছে |

-- বৌদি তোমার কি মনে হয় ? দাদা সত্যি এমন কি করতে পারেন ? আমার তো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না | আফটার অল তোমরা প্রাক্টিক্যালি তো হ্যাপি কাপল , তাই না !

সহেলীর কোথায় শবরী কোনো উত্তর দেয় না | হালকা ধমক দেয় প্রশান্তর ভাই রণজয় |

-- কি ভুলভাল বকছো ? সময় কম মাথা কাজ করছে না এতো অপ্রয়োজনীয় বেশি কথা বোলো না প্লিজ | 
-- তুমি থামো তো একটু | আচ্ছা দিভাই তুমি কি মেয়েটার সাথে দাদা কে গল্প করতে দেখেছো ? বা কাছাকাছি কখনো ?
এই প্রশ্নের উত্তর কখনো দিতে হতে পারে তা ওর আন্দাজের বাইরে | কিছুক্ষন থেমে শুধু "হুম " বলে শবরী |
-- টাকা দিতে ? দেখেছো ?
ওর মনে পরে সপ্তাহ খানেক আগে প্রশান্ত টিয়াকে একশো টাকার দু একটা নোট দিতে দেখেছিলো | কেন জিজ্ঞাসা করতে বলেছিলো , টিয়ার ভাইয়ের জ্বর তাই টাকা চেয়েছিলো টিয়া |

ওদিকে প্রেস মিডিয়া , পাড়া , আত্মীয় , অফিস সমস্ত জায়গায় ঢি ঢি পরে গেছে | এখন যা ঘটে তা সত্যি মিথ্যে যাচাইয়ের আগে পাবলিক কি খেতে চায় সেই ভাবেই ঘটনা এক প্রকার ঠিক করে ফেলা হয় | তবে এটাও তো ঠিক একটা নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়ে কিসের জন্য এতো বড়ো একটা ঘটনা এমনি এমনি বলতে পারে ?

প্রশান্তবাবু খানিক মিশুকে | অপ্রয়োজনেও লোকজনের সাথে গল্প জুড়ে দেন | হ্যা উকিল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এগুলোও তো বার করে আনছিল | 
এই কদিনে শবরীকে যেন ঠিক চেনা যায় না | শরীর ভেঙে গেছে অনেকখানি , চোখের কোনে অনেক চিন্তার মাশুলের ছাপ | নিজের স্বামী বাড়ির কাজের মেয়েকে রেপ করেছে | এ জানার পরও ও আছে এখনো সেটা কি কম !

বিল্ডিঙের লোকজন প্রায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে | বাড়ির আত্মীয় বলতে রণজয় আর সহেলী | সহেলী মোটেই থাকতে চাইছে না | গতরাতে ওদের কিছু কথা শবরীর কানে এসেছে | চিৎকার করেই তো বলছিলো ,
-- গা রি রি করছে এবাড়িতে এসে | নিজের ভাসুর কিনা রেপিস্ট তাও কাজের মেয়ে | ছিঃ | মন ভরাতে দু পয়সা খরচ করলে তো আর এদিন দেখতে হতো না | বাড়ি ফিরে সোহম কে কি বলবো ? ওদিকে আমার বাড়ির লোকজন , তাদের উত্তর দিতে হবে না ? কেন যে মরতে তোমার সাথে এবাড়ি এলাম !

চুপ করে অন্ধকার বারান্দায় বসে থাকে শবরী | রাত বাড়ে কিন্তু ঘুম আসে না | বিয়ের প্রথম সময়গুলো মনের নিভৃতে ভীড় জমায় | চোখের জলের সাথে সেদিনের সাদা কালো ছবিগুলো ভেসে বেড়ায় যেন | 
যেদিন পুলিশ প্রশান্তকে নিয়ে গেলো , যাওয়ার সময় শুধু শবরীর হাতদুটো ধরে বলেছিলো " তুমি অন্ততঃ আমাকে অবিশ্বাস করোনা |
সকালে শবরী থানায় আসে | খুব জোরাজোরি করেই একপ্রকার প্রশান্তর সাথে দেখা করে | 
পরদিন কোর্টে প্রশান্তর কেসটা ওঠে | হাতে আসে টেস্ট রিপোর্ট |
টিয়া অন্তঃসত্ত্বা |
শবরী সেদিন আর প্রশান্তর দিকে তাকায়নি একবারের জন্যও |
সেদিন ও হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো | সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল নিজের সাথে | বাড়ি ফিরেছে অনেক রাতে , একাই |

নাঃ , আর একবার উকিলের সাথে সামনাসামনি কথা বলতেই হবে | মেয়েটা প্রেগনেন্ট হলেই প্রমান হয়না প্রশান্ত দোষী | যদিও সে প্রমান দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে | শবরী জানে লড়াইটা বহুদূর | সেদিন প্রশান্তর সাথে কথা বলতে গিয়ে খেয়াল করেছে , প্রশান্ত অপ্রয়োজনীয় কথা তো দূরের কথা কোনো কথাই বলছে না | শুধু বলেছিলো আমি কোনো দোষ করিনি | 
এবার মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সময় এসেছে , আর নয় | সেই আঠেরো বছর বয়েসে বিয়ে হয়ে এবাড়িতে এসেছে | বত্রিশ বছরের সম্পর্ক এতো ঠুনকো কিছুতেই হতে পারে না | তাছাড়া ওর প্রতি প্রশান্ত যথেষ্ট কেয়ারিং প্রথম থেকেই | ভালোবাসার কোনো খামতি কখনো হয়নি | একমাত্র ছেলে দীপ যখন একসিডেন্টে মারা যায় লোকটা তখন নিজের শোক ভুলে গেছিলো শবরীর জন্য | সে কম নয় | প্রশান্ত নিজেও তখন সদ্য সন্তানহারা এক পিতা | প্রতি মুহূর্তে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো ওকে | প্রশান্তর দিক থেকে এমনটা কখনোই হতে পারেনা এমন সময়ে দাঁড়িয়েও শবরীর এতটাই বিশ্বাস | আগামীকাল রায়ের শেষ দিন | সহেলী ওর বাড়ি ফিরে গেছে , থেকে গেছে রণজয় |

কোর্টের ভেতরে একদিকে টিয়া অন্যদিকে বিধ্বস্ত প্রশান্ত | একের পর এক প্রশ্ন ছুটে আসছে | ততক্ষনে হাতে এসে পৌঁছেছে ডি এন এ. টেস্ট রিপোর্ট | 
টিয়ার পরিবারের লোকজন তখনও কথার টার্মস বুঝে উঠতে পারছিলো না | জাজের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় উঠে আসে শবরী |
-- স্যার আমি টিয়ার অন্যায়ের প্রতিকার চাই | প্রশান্তর সাথে আমি টিয়ার বিয়ে দেবো | 
পাশে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত জুলজুল করে ওর দিকে তাকিয়ে | অপরাধী জানলোনা ওর দোষ কি তবু ওর ফাঁসি হয়ে গেলো যেন |
এবার মিনমিনে টিয়ার গলার স্বর খানিক ঝলসে উঠলো | 
-- না , আমি ওই বুড়োকে বিয়ে করবো না | 
সুকৌশলে উকিল খানিক এগিয়ে আসে টিয়ার দিকে | জিজ্ঞেস করেন ,
-- তবে কাকে তুমি বিয়ে করতে চাও টিয়া ? 
 -- ওই নয়ন কাকার ছেলে শিবুকে | 
টিয়ার মা জামাইবাবু একেঅন্যের চোখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো | এবার কারুর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না |

শবরী জানতো বিয়ের কথা না বললে এগোপন সূত্র বাইরে আসার নয় |
জানা যায় পাড়ার এক পাগলাটে ছোকরার সাথে টিয়ার প্রেম | তারই ফসল টিয়ার পেটে | কিন্তু এতে প্রশান্তর নাম এলো কিভাবে ! আমরা যে ধাঁচে বাকিটা ফেলে সিদ্ধান্তে আসি এক্ষেত্রে তা হয়নি | বেকার ছেলেটার হাতে টাকা আর টিয়ার সুন্দর সংসার , এই সকল সমস্যার সমাধানের একটাই সূত্র হয়েছিল প্রশান্ত | নির্ভেজাল গোবেচারা ভালো মনের লোকটাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল টিয়া আর ওর পরিবার | মিশুকে লোকটা টিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ছিল না | ওর সহজ সরলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল | মামলায় রায় বেরোয় , সাজা পায় টিয়া এবং ওর পরিবার |

এই প্রথম বুঝি তথাকথিত গরিব বড়োলোক শ্রেণীপ্রকার মাথায় না রেখে ন্যায় অন্যায়ের বিচার হলো |
অন্যদিকে স্বসম্মানে ছাড়া পেলো প্রশান্ত | টিভি , মিডিয়া , চ্যানেল প্রতিটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো টিয়াদের ধূর্তমির খবর | প্রশান্ত ফেরার দিনই ওদের বিল্ডিঙের সেক্রেটারি নিজেই ঘোষণা করলেন সেদিন রাতে একসাথে ওদের ছাদে পিকনিক হবে | আসলে পিকনিক মানে সবান্ধবে ক্ষমা চাওয়া আর কিছু নয় | শবরী প্রশান্ত রাজি হয় | আর জটিলতা নয় , সুস্থ জীবন সম্মান ভালোবাসা জীবনে বেঁচে থাকার কতখানি অঙ্গ তা এতদিনে টের পেয়েছে ওরা |
রণজয়ের স্ত্রী সহেলী ওর ছেলেকে নিয়ে এবাড়িতে ফিরে এসেছে |যা ঠিক সত্যি তা সর্বকালের সব সময়ের জন্য সঠিক রাস্তা বেছে নেবেই | আজও সেই ধারার ব্যতিক্রম হলোনা | খারাপ সময় ভুলতে খানিক সময় লাগে ঠিকই তবু চেনা সময় তার গতি ফেরালো | 
আজ অনেকদিন পর শবরী প্রশান্ত ওদের চেনা পৃথিবীতে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে |

**অন্তরা**