১১:০৫ এএম, ৮ এপ্রিল ২০২০, বুধবার | | ১৪ শা'বান ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

জনমনে স্বস্তি

করোনা রোধে প্রশাসনকে সহায়তায় মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী

২৫ মার্চ ২০২০, ০৭:২৯


করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী।  গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তায় বৈঠক করেছে সেনাবাহিনী।  তবে সমন্বয় শেষে আজ বুধবার থেকে সেনাবাহিনী পুরোপুরিভাবে কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।  পাশাপাশি মাঠে থাকছে নৌ এবং বিমানবাহিনীও।  গতকাল বিভাগ ও জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সর্তকতা ও সামাজিকভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্নকরণ নিশ্চিত করতে টহল দেবে সেনাবাহিনী।  এছাড়া বিদেশ ফেরতদের হোম কোয়ারেনটাইন নিশ্চিতের কাজেও বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা দেবে সেনাবাহিনী। 

সূত্র জানায়, দেশের বিভাগ ও জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সেনাবাহিনীর বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ৫ থেকে ৭ জনের অধিক সংখ্যক ব্যক্তি জড়ো হওয়া ঠেকাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে কাজ করবেন।  হোটেল রেষ্টুরেন্ট, শপিং মল, সভা সমাবেশ, ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠানের নামে জমায়েতসহ কেউ দলবদ্ধ হয়ে যাতে জড়ো না হতে পারেন।  জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোন লোক ঘরের বাইরে বের না হওয়া, বের হওয়া মানুষ যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলাফেরা করেন সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করবে সেনাবাহিনী। 

নৌবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’এর আওতায় ভোলা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বাগেরহাট ও বরগুনায় নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। 
আইএসপিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ এবং ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার দেশের সব জেলায় সশস্ত্রবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।  সে নির্দেশনা মোতাবেক ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় গতকাল মঙ্গলবার দেশের সব বিভাগ এবং জেলা শহর ও কিছু উপজেলায় করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে মোতায়েনের অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় করেছে সেনাবাহিনী। 

আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি আরও বলা হয়, পরবর্তীতে আজ বুধবার থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে পুরোপুরিভাবে কাজ শুরু করবে সেনাবাহিনী।  এসময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত এবং বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপে সহায়তা ও সমন্বয় করবেন সেনা সদস্যরা।  এছাড়া বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনে মেডিক্যাল সহায়তা দেবে সেনাবাহিনী।  এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করবে নৌবাহিনী।  আর বিমানবাহিনী হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরি পরিবহন কাজে নিয়োজিত থাকবে। 

সেনাবাহিনীর কোয়ারেন্টাইন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের নম্বর পরিবর্তন : সেনাবাহিনীর কোয়ারেন্টাইন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে যোগাযোগের জন্য আগের সব নম্বরের পরিবর্তে শুধু ০১৭৬৯০৪৫৭৩৯ নম্বরে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।  গতকাল মঙ্গলবার আইএসপিআরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

আমাদের টাঙ্গাইল জেলা সংবাদদাতা জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কল্পে জেলা প্রশাসনকে সহায়তার জন্য টাঙ্গাইলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।  এ বিষয়ে গতকাল ঘাটাইল সেনানিবাসের লে. কর্নেল সোহেল এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলামের সাথে স্বাক্ষাত করেন।  এসময় সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।  এময় উপস্থিত ছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা.মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান।  জেলা সদর ছাড়াও জেলার ১২টি উপজেলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী কার্যক্রম শুরু করেছে। 

সাতক্ষীরা থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, করোনোভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সিভিল প্রশাসনকে সহযোগিতার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এক বৈঠক করেছেন লে. কর্নেল ফারহান।  গতকাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক এস, এম মোস্তফা কামাল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বদিউজ্জামান ও মেজর সাবের। 

আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রস্তুতি নিতে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা।  গতকাল মঙ্গলবার আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জোবায়ের আহমেদের সভাপতিত্বে উপজেলা মিলনায়তনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।  এসময়ে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর কাজী আসিফ আহমদ, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নুর, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু জাহিদ মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল মাহমুদ, চেয়ারম্যানদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।  বৈঠকে প্রশাসনের সাথে সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে।  ৫ থেকে ৭ জনের অধিক সংখ্যক ব্যক্তি জড়ো হওয়া ঠেকাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জোবায়ের আহমেদ।  তিনি আরো জানান, উপজেলার হোটেল রেষ্টুরেন্ট, শফিং মল, সভা সমাবেশ, ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠানের নামে জমায়েতসহ কেউ দলবদ্ধ হয়ে যাতে জড়ো না হতে পারে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোন লোক ঘরের বাইরে বের না হওয়া, বের হওয়া লোকজন যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলাফেরা করে সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করবে সেনাবাহিনী। 

আমাদের বরিশাল ব্যুরো জানায়, করোনা প্রতিরোধে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে সেনাবাহিনী অবস্থান নিতে শুরু করেছে।  বুধবার থেকে সেনা বাহিনী জেলা প্রশাসনের সাথে মাঠে নামবে জানা গেছে। 

চট্টগ্রামে সমন্বয় সভা
আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সেনাবাহিনী মোতায়েন করায় বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে করোনা মহামারীর নিয়ে শঙ্কা, উৎকণ্ঠার মধ্যেও জনমতে স্বস্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে।  সেনাবাহিনীর সদস্যরা সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ নিশ্চিত করবে।  এছাড়া হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতের কাজেও বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা দেবে সেনাবাহিনী।  চট্টগ্রামের পাঁচটি স্থান প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য নির্ধারণ করেছে জেলা প্রশাসন।  সেখানে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন।  গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান ডিসি। 

এতে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ।  সভায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহরিয়ার, ৩৪ স্পেশাল ওয়ার্কসের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তানভীর, কুমিল্লার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজিম, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থত ছিলেন। 

ডিসি ইলিয়াস হোসেন বলেন, সভায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের কৌশল নির্ধারণ হয়েছে।  নগরীতে লোকসমাগম যাতে না হয় সেজন্য টহল দেবে সেনাবাহিনী।  ৫-৭ জন যেন জড়ো হতে না পারে, নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে যেন চলাফেরা করে সেটা মূলত সেনাবাহিনী নিশ্চিত করবে।  ব্যারাকের বাইরে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প কোথায় হবে তা সেনাবাহিনী আজ বুধবার নির্ধারণ করবে জানিয়ে তিনি বলেন, কয়টা ক্যাম্প হবে বা কোথায় হবে, সেটি হবে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। 

ডিসি বলেন, অনেকেই হোম কোয়ারেনটাইনে থাকছে না।  এই হোম কোয়ারেনটাইন নিশ্চিতের কাজে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করবে।  যারা হোম কোয়ারেনটাইন মানবে না, তাদের সেনা সহযোগিতায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে নিয়ে যেতে হবে।  পরবর্তী সময়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া গেলে তাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী আমাদের সহযোগিতা করবে। 

সভায় জানানো হয়, যারা হোম কোয়ারেনটাইন মানছেন না, তাদের এখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে পাঠানো হবে।  এছাড়া যদি করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং আইসোলেশনে পাঠানোর মতো কাউকে পাওয়া যায়, তাহলে তাদের পুরো পরিবারকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে পাঠানো হবে।  তাদের রাখার জন্য নগরীর সিআরবিতে রেলওয়ে হাসপাতাল, হালিশহরে পিএইচ আমিন একাডেমি, নগরীর বহদ্দারহাটে সিডিএ গার্লস স্কুল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল এবং পটিয়া উপজেলায় মোজাফফরাবাদ স্কুল নির্ধারণ করা হয়েছে। 

আর শনাক্ত রোগী আইসোলেশনের জন্য দুইটি হাসপাতালে ২৫০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে।  জেনারেল হাসপাতালে ১৫০ ও ফৌজদারহাটে বিআইটিআইডিতে ১০০ শয্যা আইসোলেশনে রাখার জন্য প্রস্তুত করা এছাড়া চমেক হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ‘ফ্লু কর্নার’ চালু করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।  উপজেলা পর্যায়ে ১০টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।  উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা যদি মনে করেন কাউকে আইসোলেশনে পাঠাতে হবে তাদের পাঠিয়ে দেবেন।  চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে স্বাস্থ্য বিভাগ। 

ব্যুরো জানায়, গতকাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে।  জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী অলরেডি মাঠে নেমেছে।  তারা করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যাকতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। 

আমাদের কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা জানান, করোনা মোকাবেলা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসনকে সহায়তা করতে ইতোমধ্যেই রংপুর থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল আসছে বলে জেলা প্রশাসক জানান।  তাদের সাথে মত বিনিময় করে কিভাবে করোনা সংক্রমণসহ সার্বিক বিষয়ে মোকাবেলা করা যায় তা ঠিক করা হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানিয়েছেন।  তিনি বলেন,সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ণেল পর্যায়ের একজন সেনা কর্মকর্তা এখানে জেলা প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করবেন।