৫:১৭ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার | | ১ সফর ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

কর্মকর্তাদের নীতি ও দুর্নীতি

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:২৩


চিররঞ্জন সরকার


নীতি বলতে আমরা সাধারণত রীতি, নিয়ম, প্রথা, প্রণালী ইত্যাদি বুঝি।  অভিধান মতে নীতি হলো : কর্তব্য নির্ধারণের উপায় বা রীতি; ন্যায়সংগত বা সমাজের পক্ষে হিতকর বিধান; হিতাহিতবিষয়ক উপদেশ; ন্যায়-অন্যায় বা কর্তব্য-অকর্তব্য বিচার।  প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত সবার জন্য গ্রহণযোগ্য এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশনাকে নীতি বলে।  নীতিবোধের অভাবই হচ্ছে দুর্নীতি।  কর্তব্য ও নীতির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে কিছু করাটাই হচ্ছে দুর্নীতি।  দুর্নীতি যে কেউ করতে পারে।  তবে আমাদের দেশে অন্য সব দুর্নীতিকে ছাপিয়ে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক দুর্নীতি।  বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা নানা রকম অনিয়মের মাধ্যমে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছেন, অবৈধভাবে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।  এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা শীর্ষে রয়েছেন। 

সরকারি কর্মকর্তারা অনেকভাবে সুবিধা গ্রহণ করেন।  এ নিয়ে তাদের মধ্যে তেমন কোনো মনোযাতনা বা মনোপীড়া দেখা যায় না।  সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণের কথাই ধরা যাক।  কাজে গতি আনতে আগে যুগ্মসচিব থেকে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ সুযোগ পেতেন।  উপসচিবরা এ সুবিধা পেতেন না।  বর্তমান সরকার প্রশাসনের উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদেরও একই সুবিধা দিয়েছে।  এসব কর্মকর্তাকে নিজস্ব গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।  এই ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ঋণ গ্রহণকারী কর্মকর্তাকে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে মাত্র ১০ লাখ টাকা, আর বাকি ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করবে সরকার।  আর গাড়ির রক্ষাবেক্ষণ খরচ বাবদ প্রতি মাসে পাওয়া ৫০ হাজার টাকার পুরোটাই জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব বাবদ আয় করা সরকারের তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হচ্ছে।  সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ ১২০টি সমান কিস্তিতে অর্থাৎ ১০ বছরের মধ্যে আদায়যোগ্য।  ৩০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা।  তবে কিস্তির হার পুনর্নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে।  অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই সুযোগের অপব্যবহার করে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া টাকায় কেনা গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে ভাড়ায় খাটাচ্ছেন।  আবার খরচ বাবদ টাকাও নিচ্ছেন।  অনেকে একইসঙ্গে সরকারি পুলের গাড়িও ব্যবহার করছেন।  এমনও দেখা গেছে, একজন সচিব নিজে একসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ৯টি গাড়ি একা ব্যবহার করেছেন।  শুধু তাই নয়, তিনি এদিক-সেদিক করে ভাউচারে এই ৯টি গাড়ির তেল খরচও নিজে নিয়েছেন। 

আমাদের দেশে এ ধরনের দুর্নীতি অবাধে চলছে।  রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কিছু মানুষকে দুর্নীতি করার সুযোগ প্রদান করছে।  মূল প্রশ্ন নৈতিকতার।  একটা সুযোগকে যারা অবৈধভাবে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেন, তখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাদের কর্মজীবনে অগ্রাধিকারের তালিকায় নৈতিকতার কোনো স্থান নেই, আছে কেবল সুবিধাবাদের।  দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভালো লাভ করা যায়, ধরা পড়ার ঝুঁকি কম।  অর্থনীতির যুক্তি বলে যে, দুর্নীতির সম্ভাব্য শাস্তির ‘খরচ’ যদি প্রত্যাশিত ‘আয়’-এর চেয়ে বেশি হয়, তবেই দুর্নীতি নিবারণের একটা সম্ভাবনা থাকে।  কিন্তু আমাদের দেশে এখন প্রত্যাশিত আয় বিপুল, সম্ভাব্য খরচ খুব কম।  ফলে প্রচলিত ব্যবস্থায় দুর্নীতি উৎসাহিত হয়। 

দুর্নীতি এক গভীর ব্যাধি।  সমাজকে তা ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।  দুর্নীতি গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে, মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটায়, বাজারকে বিকৃত করে, জীবনের মান নষ্ট করে, নানা রকম অপরাধ, সন্ত্রাস এবং নিরাপত্তার অন্য নানা শত্রুর শক্তিবৃদ্ধি ঘটায়।  এই দুরাচার ছোট বা বড়, ধনী এবং দরিদ্র, সব দেশেই দেখা যায়, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশেই দুর্নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি।  উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ সম্পদ দুর্নীতির কারণে বিপথে চালিত হয়, তার ফলে দরিদ্র মানুষের বিপুল ক্ষতি হয়।  সরকারের অত্যাবশ্যক পরিষেবা সরবরাহের সামর্থ্য দুর্নীতির প্রকোপে ব্যাহত হয়, অসাম্য এবং অন্যায় উৎসাহিত হয়, নিরুৎসাহিত হয় বিদেশি অনুদান ও বিনিয়োগ। 

দুর্নীতি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।  কিন্তু আইনে এই অপরাধের কোনো পাইকারি সংজ্ঞা নেই।  ‘এথিকস ইন গভর্ন্যান্স’ বা শাসনের নৈতিকতার জায়গাটা এখানে খুবই খাটো।  আইনে আছে, কোনো সরকারি কর্মী যদি আইনসংগত প্রাপ্যের অতিরিক্ত কিছু পান এবং তার বিনিময়ে কাউকে কোনো অন্যায় সুযোগ দেন বা কাউকে কোনো ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেন, তা হলে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে।  যদিও শাস্তি প্রদানের ঘটনা আমাদের দেশে খুব একটা ঘটে না। 

প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির মডেল না বদলালে, মন-মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কি দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে? যে সব মধ্যবিত্ত দেশজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় গলায় কথা বলেন, তারা ফ্ল্যাট-বাড়ি কেনা-বেচার সময় কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিবিধ উপায় অবলম্বন করেন না কি? ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ঘুষ দেন না, অথবা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পুলিশের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে পালিয়ে যান না? ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য ব্ল্যাকে টিকিট কাটেন না? সামান্য কিছু টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দিতে অসাধু পন্থা অবলম্বন করেন না?

‘দুর্নীতি’ কথাটার মধ্যেই অনেক ধোঁয়াটে ব্যাপার আছে।  যেমন, কখন বলা চলে দুর্নীতি বেড়েছে? যদি অনেক বেশি লোক ঘুষ নেয়, নাকি যদি অনেক বেশি টাকা ঘুষ দিতে হয়? যদি কাজ উদ্ধার করতে স্থানীয় সরকারের ছোট মাপের নানা কর্তাকে কয়েকশো কি কয়েক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়, তা হলে মনে হয়, দুর্নীতি তো আরও বেড়ে গেল! কিন্তু বড় বড় মন্ত্রী-আমলাদের দপ্তরে বন্ধ দরজার পেছনে যে সব রফা হয়, সেখানে বহু কোটি টাকার অপচয় কেউ টেরও পায় না।  দুর্নীতি বেশি চোখে পড়া মানেই দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া, এমনটা বলা তাই সহজ নয়।  এ দেশে কোথাও কোথাও ট্রাফিক পুলিশ হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, পশ্চিমের দেশগুলোতে যা ভাবা যায় না।  তাই মনে হয় আমাদের দেশে দুর্নীতি বেশি।  কিন্তু ওই সব দেশে সরকারের ওপর মহলে টাকার পরিমাণের দিক দিয়ে ঘুষ সব সময় কম নয়। 

নানা দেশে নানা সময়ে দেখা যায় যে দুর্নীতি নিয়ে দু’রকম বিপরীত অবস্থা তৈরি হতে পারে।  এক, যেখানে সবাই মনে করছে, ‘সবাই ঘুষ খায়, তা হলে আমি খাব না কেন?’ সে ক্ষেত্রে ঘুষ খাওয়ার ঝুঁকিটা কম, লোকের কাছে নাম খারাপ হওয়ার ক্ষতিটাও কম।  আর দুই, যেখানে অধিকাংশ মানুষ ভাবে, ‘কেউ ঘুষ খায় না, আমি খাই কী করে?’ দুর্নীতি কমাতে হলে প্রথম অবস্থা থেকে দ্বিতীয় অবস্থায় দেশকে নিয়ে যেতে হবে।  কেবল শাস্তি আর নজরদারি বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো যাবে না।  শাস্তি ছাড়াও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমে যায়, এবং যাতে ঘুষ না-খাওয়ার মানসিকতা বাড়ে।  কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় তা কি সম্ভব?

দুর্নীতির রকম ও তার মোকাবিলার বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ আমেরিকান অ্যাকাডেমিক রবার্ট ক্লিটগার্ড ভ্রষ্টাচারের প্রকার তথা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন।  ওই তালিকার প্রথম ধাপে দুর্নীতি ও তার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।  দ্বিতীয় ধাপে, সিস্টেমস অ্যানালিসিস-ই মুখ্য বিষয়।  আর তালিকার তৃতীয় অধ্যায়ে সমাজের সর্ব স্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভ্রষ্টাচার মোকাবিলায় ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’ দমন করার পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।  আমাদের দেশে কোনোটাই জোরদার নয়।  তাহলে দুর্নীতি কমবে কীভাবে? সরকারের সেই সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার কোথায়?

লেখক:লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com