৯:৪৪ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, রোববার | | ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

গুলতেকিনের বিয়ে, নারী জাগরণ ও মার্ক্সবাদ

২৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:২৩


কাকন রেজাঃ

আমরা কেন জানি সহজ কথা বুঝি না, সরল পথে চলি না।  বিশেষ করে বাংলাভাষী, সে হোক স্বাধীন বাংলাদেশ কিংবা পরাধীন পশ্চিমবঙ্গের, এদের বোধহয় কোন বিষয়কে একটু না পেচালে হয় না।  বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন যারা উচ্চবিত্তদের সাথে রেসে রয়েছে তাদের।  এরা মানুষের জীবনাচরণ তথা সামগ্রিক সংস্কৃতিকে দেখে অদ্ভুত এক দৃষ্টিকোন থেকে।  আর সেই দৃষ্টি বামের।  মার্ক্সবাদের দূরবীনে চোখে রেখে তারা জীবন দেখে।  এটাকেই তারা আধুনিকতা মান, প্রগতি মানে।  অথচ মার্ক্সবাদের মূল কথাই তারা ভুলে যায়।  তারা গুলতেকিন খানের বিয়েকেও মার্ক্সবাদের সাথে পেচিয়ে ফেলে। 

হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খান ষাটোর্ধ্ব বয়সে বিয়ে করেছেন।  আমাদের দেশের সার্বিক সংস্কৃতি এর বিরুদ্ধে নয়।  সার্বিক বলতে আমি ধর্মীয় বিশ্বাসটাকেও সাথে রাখছি।  আমাদের দেশের বেশি সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী।  ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ের অনুমোদন করেছে সেই প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই।  আর সেই বিয়েতে বয়সের হিসাবও রাখা হয়নি।  ষোল বা ষাট কোনো বয়সেই বিয়েতে বাধা নেই।  ধর্ম নিয়ে আগে কথা শুরু করলাম এই জন্য যে, কথিত বামের দৃষ্টিকোনে ধর্মটাই আগে বাধে।  আমাদের সার্বিক ধর্মীয় সংস্কৃতি এমন বিয়ের পক্ষে।  ইসলাম মানুষকে নতুন জীবন শুরুর উৎসাহ দেয়।  তবে সামান্য বাধা যেটা আছে সেটা আমাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতির।  যে সংস্কৃতির উৎপত্তি ব্রাহ্মণবাদের ঘটি হতে। 

এক সময় সতিদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে এ দেশের ক্রম আধুনিকমনস্ক মানুষদের।  এরপর বিধবা বিবাহ প্রথা প্রবর্তনের সংগ্রামের কথাতো সবারই জানা।  আমাদের আঞ্চলিক যে সংস্কৃতি তা বিশেষ করে নারীদের নতুন জীবন শুরু করার পক্ষে ছিলো না।  কিন্তু আমাদের এই ভূখন্ডে ইসলামের প্রসার সেই সংস্কৃতিকে অনেকাংশেই বদলে দিয়েছিলো।  নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ তথা তালাকের স্বাধীনতা, নতুন জীবন শুরু করার উৎসাহ ইসলামই দিয়েছিল। 

গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে তাই এ দেশের বেশিরভাগ মানুষের কোনো মাথাব্যথা ছিলো না, এখনো নেই।  হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী শাওন নিজেও যদি নতুন জীবন শুরু করতে চায়, ইসলাম তথা আমাদের সার্বিক সংস্কৃতি তার অনুমতি দেয়।  সার্বিক সংস্কৃতির ব্যতিক্রম যারা তাদের চোখেই লাগে এমন বিয়ে বা নারীদের নতুন জীবন শুরুর বিষয়গুলি।  তারাই মনে হয় কুন্ঠিত হয়।  না হলে গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে সার্বিক সংস্কৃতির অংশের কেউ মাথা ঘামায়নি।  তারা এটাকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছে, যার ফলে এটা নিয়ে আলোচনাই উঠেনি।  যা উঠেছে তা হলো সার্বিক সংস্কৃতির ব্যতিক্রমদের মধ্যে। 

তাদের কেউ কেউ গুলতেকিন খানের বিয়েকে নারী জাগরণের সাথে তুলনা করেছেন।  কি হাস্যকর কথা।  বিধবা বিবাহ প্রথা প্রবর্তনে যে সামাজিক সংগ্রামের প্রয়োজন হয়েছিলো, তেমন অবস্থা কি সৃষ্টি হয়েছে গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে! হয়নি।  কোথাও কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া ছিলো? ছিলো না।  তবে এই বিয়ে নারী জাগরণের প্রতিক হলো কিভাবে? আমাদের গ্রামীণ সমাজে এমন ঘটনা অহরহ।  তালাক এবং পরবর্তী নতুন জীবন শুরু এটা আমাদের গ্রামীন সমাজেও স্বাভাবিক ব্যাপার।  আমাদের কাজের বুয়া সাতদিন ধরে আসেনি।  সাতদিন পরে আসলো নতুন শাড়ি পড়ে, হাতে মেহেদি।  প্রশ্ন করলাম, কী ব্যাপার সাতদিন আসনি কেন? লাজুক উত্তর, ‘ভাইজান বিয়া করছি। ’ হ্যাঁ, সে আগের জনকে ছেড়ে দিয়ে আবার অন্য একজনকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছে।  এটা তার কাছে স্বাভাবিক, যেটা আমাদের মতন কথিত শহুরে এবং দাবিকৃত মার্সিতেস্টদের কাছে অস্বাভাবিক।  অথচ এটাই আমাদের সংস্কৃতি।  এখানে খুঁচিয়ে নারী জাগরণ বের করা স্রেফ বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। 

আমাদের গ্রামীণ সমাজে নারীরা ক্ষেতে কাজ করে, ইট ভাঙে, করে মজদুরি।  কই, তাদের পরিবার থেকে তো বাধা দেয়া হয় না, বরং নিজেদের বাঁচার স্বার্থেই তারা কাজে নামে।  অনেককাল আগে থেকেই এদেশের নারীরা এমনসব কাজ করে আসছে, এতে খুব একটা বাধার কথাতো কানে আসেনি।  কোনো ধর্মীয় অনুশাসনে এমন কর্মজীবী নারীদেরতো একঘরে করা হয়নি।  যেটা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দেখি।  দেখি এক ধর্মের ভেতরেই দলিত আ ব্রাহ্মণদের বিভেদ।  আমাদের এই ভূখন্ডের সার্বিকতা কোনকালেই সে সংস্কৃতিকে ধারণ করেনি, বহন করেনি।  তবে সার্বিকতার ব্যতিক্রম শ্রেণিটি, যে শ্রেণি কথায় কথায় নিজেদের আধুনিক বলেন, নানা কান্ডে আধুনিকতা জাহির করেন তারাই শুধু এসব নিয়ে কথা বলেছেন।  যেমন বলছেন গুলতেকিন খানের বিয়ে নিয়ে।  গুলতেকিন খান তার জীবনের প্রয়োজনেই বিয়ে করেছেন।  তার পরিবারের সম্মতিতেই করেছেন।  সুতরাং এটাকে নিয়ে নারী জাগরণের গল্প নেহাতই ‘গপ্পো’, এর বেশি কিছু নয়। 

‘অসূর্যস্পশ্যা’ বলে একটা শব্দ আমাদের প্রাচীনতম সংস্কৃতিতে চালু ছিলো।  সূর্য স্পর্শ করেনি মানে যে সূর্যরে আলোও দেখেনি, এমন নারীকে যে সংস্কৃতিতে আদর্শ মানা হতো।  অমন অন্ধকারের সংস্কৃতিকে এই ভূখন্ড থেকে দূর করেছিলো ইসলাম।  ফলে এই ভূখন্ডের সার্বিক সংস্কৃতি ছিলো নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে।  ইসলামের অজুহাতেও কিছু মানুষ এর বিরোধীতা করলেও আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে তার খুব একটা আছর পড়েনি।  কট্টরপন্থা সব দর্শনেই থাকে।  সে হোক ধর্মীয় বা সামাজিক দর্শন।  সেই কট্টরপন্থা এখনো সেই ‘অসূর্যস্পশ্যা’র স্বপন দেখে, যেখানে কুমারিত্ব শুদ্ধতার রূপ হিসাবে পরিগণিত এবং অর্চিত হয়।  এটা মূলত সার্বিক সংস্কৃতির ব্যতিক্রমী একটি অংশ।  যে অংশের চর্চা আমাদের গ্রামীণ সমাজ শহুরেদের আগেই বর্জন করেছিলো।  বাঁচার তাগিদ চাষের কাজে পুরুষে পাশাপাশি হাত লাগিয়েছিলো নারী।  নারী জাগরণের শুরু সেখান থেকেই, তারাই পথিকৃত প্রকৃত নারীবাদের।  আজকে যেমন পোশাক শ্রমিকরা। 

‘মার্ক্সবাদ’ এর সাইনবোর্ড ইদানিংকালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  ‘প্যাশন’ যখন ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়ায় গন্ডগোলটা লাগে তখনই।  একজন দুর্গাপুজায় যখন দেবি দর্শন করে বেড়ান তখনও তিনি থাকেন ‘বাম’।  আর যখনই তিনি ঈদের নামাজ পড়তে যান তখনি হয়ে উঠেন ‘ডান’।  বামদের দেবি দর্শনে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো নামাজে।  দেবি দর্শন যখন আধুনিকতা হয়ে উঠে এবং নামাজকে ভাবা হয় পশ্চাতপদতা গেঁড়াকলের গিট্টুটা সেখানেই।  কথিত বামদের এমন গেঁড়াকলে তখন মার্ক্সবাদ নিজেই কেঁদে উঠে।  খোদ মার্ক্স থাকলে নির্ঘাত এ অবস্থায় বলে উঠতেন, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। ’ মার্ক্স মরে গিয়ে বেঁচেছেন, না হলে তার অবস্থা হতো হুমায়ূন আহমেদের হিমু’র মতন।  হুমায়ূন আহমেদ স্বয়ং হিমু বিষয়ক বইয়ে, হিমু সাজা হিমুদের কথা লিখেছিলেন।  তিনি, হিমু সাজাদের প্রশ্ন করেছিলেন, হিমু হতে হলে কি করতে হয়।  তার উত্তরে যা শুনেছিলেন, তাতে হুমায়ূন তথা স্বয়ং হিমু’রই ভিড়মি খাবার অবস্থা।  হিমু না পড়ে কিংবা পড়েও না বুঝে হিমু হয়ে উঠতে যাওয়ার চেষ্টাটা মূলত ভয়াবহ।  যেমনটা গুলতেকিন খানের বিয়েতেও মার্ক্সবাদের আছর দেখা।  এমনটাই করে চলেছেন আমাদের কথিত মার্ক্সবাদীরা। 

লেখক : কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।