৮:০৮ এএম, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, বৃহস্পতিবার | | ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

জনস্বার্থ এখন রাজনীতিতে উপেক্ষিত ক্ষমতার দ্বদ্ব বাড়ছেই

১৩ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:২২


দেশের রাজনীতির মাঠে নেই কোনো রাজনীতির কর্মসূচি।  বক্তৃতা, বিবৃতি ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বৃত্তে আবদ্ধ রাজনীতি।  সর্বোত্রই জনস্বার্থ উপেক্ষিত।  নেই মাঠের আলোচনা, নেই জনগণের দাবি, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যুবৃদ্ধি প্রতিবাদে কোনো সভা-সমাবেশ।  প্রকাশ্যে ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ। 

এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়ে গেছে।  পাওয়া না পাওয়া, কম পাওয়া-বেশি পাওয়া নিয়ে মূলত এই বিরোধ।  সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ‘নাচের পুতুল’ এবং মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ‘পথহারা পথিক’ হওয়ায় ক্ষমতাসীন দল ও দলটির অঙ্গ সহযোগী নেতারা নিজেরাই বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন।  মিডিয়ায় সে খবর ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।  এই পরিস্থিতিতে সঠিক গণতন্ত্র চর্চার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।  তারা বলছেন, একপক্ষ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় প্রতিপক্ষ নিজ দলই।  যাতে বাড়ছে অন্তর্কোন্দল, সেই সাথে সত্যচর্চাও।  এর জন্য রাজনৈতিক নীতিহীনতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।  নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও বসুরহাট পৌরসভার দল মনোনীত মেয়রপ্রার্থী মির্জা কাদের ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের বক্তব্যে বিব্রত সরকারি দল আওয়ামী লীগ।  দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, প্রকাশ্য জনসমাবেশে একজন কেন্দ্রীয় নেতা ও একজন জেলা পর্যায়ের নেতা যা বলেছেন তা দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী।  তাদের বিষয়ে অবশ্যই দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।  এদিকে রাজনৈতিক মাঠে বিরোধী দল বিএনপি ১২ বছর ধরে জনগণের দাবি আদায় কিংবা তাদের দলের নেতার মামলা বিষয়ে তেমন ভাবে মাঠে টান টান সভা সমাবেশ করতে পারেনি। 
এ বিষয়ে রাজনৈতিক ও স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক এবং সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হয়।  তখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলো নামকাস্ততে থাকে।  তখন ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার জন্য দ্ব›দ্ব করে থাকেন।  আবার কিছু কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি মনে করেন ক্ষমতা পরিবর্তন হওয়ার দরকার।  তিনি বলেন, আমরা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আছি।  সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে।  সরকারি দল-ই পারে দেশের রাজনৈতিক পথ সুগম করতে। 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, অবস্থা বর্তমানে এতটাই বিপর্যয়কর অবস্থায় দাড়িয়েছে, গণতন্ত্র এবং ভোটাধিকার হরণকারী নিশিরাতের এই সরকারের নেতা-মন্ত্রী-এমপি-মেয়ররা দুর্নীতির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে এখন নিজেরাই একে অপরের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু হয়েছে।  সরকারের মেগা মহাদুর্নীতির মহাসাগর থেকে ছিটেফোটা চিত্র দু-একজন নেতার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা শুরু হয়েছে আগামী আরো বেরিয়ে আসবে।  দেশে এখন ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম গতকাল সচিবালয়ে বলেছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক ও বর্তমান মেয়রের কোনো বিষয়ে মতের পার্থক্য হতে পারে, তবে সময়ের ব্যবধানে তা ঠিক হয়ে যাবে। 
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতা ও সভাপতি মন্ডলির সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলছেন, এসব স্পষ্টত দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ।  অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে দলের কোনো পর্যায়ের নেতাই প্রকাশ্যে এভাবে কথা বলতে পারেন না।  দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে এ বিষয়ে আলোচনা শেষে দল থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। 

জানা গেছে, ২০০৬ সালের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বন্ধ ছিল।  ২০০৮ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেনাসমর্থীত সরকারের বিরুদ্ধে দেশের সকল রাজনৈতিক দল আন্দোলন শুরু করে।  ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ উমুক্ত করলেও তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চাপে তা ক্ষীণ হয়।  তা এখনো এমনই রয়েছে। 

দুই দলের মার মার, কাট কাট রাজনীতির সেই সময় যেন এখন আর ধরা দেয় না।  নেই দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের বাক যুদ্ধ, কিংবা রাজনৈতিক টান টান উত্তেজনা ও সভা সমাবেশ এবং মিছিল-মিটিং।  তবে হঠাৎ করেই রাজনীতিতে শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক সত্যচর্চা।  যেখানে প্রতিপক্ষ নিজ দলই।  এখন রাজনীতির কেন এমন রুপ? বিশ্লেষকরা বলছেন, একপক্ষ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় প্রতিপক্ষ নিজ দলই।  যাতে বাড়ছে অন্তর্কোন্দল, সেই সাথে সত্যচর্চাও।  এক সময় যে রাজনীতির আলাপ জুড়ে থাকতো আমজনতার স্বার্থের কথা।  এখন সেখানে প্রকাশ্যে ক্ষমতার দ্ব›দ্ব আর দুর্নীতির শ্বেতপত্র।  এর জন্য রাজনৈতিক নীতিহীনতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।  এই সংকট শুধু ক্ষমতাসীনে নয়, কাঠগড়ায় বিরোধীপক্ষও।  গত কয়েকদিন ধরে সরকারি দলের সিনিয়র দুই নেতাকে শোকজের ঘটনায় সমালোচনাবিদ্ধ বিএনপির রাজনীতি।  অথচ, কথা ছিল সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে যাদের রাজপথে থাকার কথা।  পঞ্চাশ বছরের স্বাধীন দেশটার রাজনীতির এই ব্যাকারণ না পাল্টালে, রেশ টানতে হবে সবার। 

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন বলেছিলেন, তাপস ডিএসসিসি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলাবাজি করে চলেছেন।  আমি তাকে বলব, রাঘববোয়ালের মুখে চুনোপুঁটির গল্প মানায় না।  কেননা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে হলে সর্বপ্রথম তার নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।  অথচ তিনি উল্টো কাজ করছেন।  দায়িত্ব নেয়ার পর তাপস ডিএসসিসির শত শত কোটি টাকা তার নিজ মালিকানাধীন মধুমতি ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন।  তার এ বক্তব্য রাজনীতির মাঠে বিব্রত সরকারি দল আওয়ামী লীগ। 

আগামী ১৬ই জানুয়ারি নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়রপ্রার্থী আব্দুল কাদের মির্জা নিজ দলের এমপি ও নিজের ভাই দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে মন্তব্য করেন।  তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগেরও সহ-সভাপতি।  আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন।  তার উত্তরসূরি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাও মানুষের মধ্যে কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার সাথে নিজের কোনো সম্পর্ক নেই।  একইসাথে মামলার আবেদন প্রত্যাহারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।  মেয়র তাপস বলেন, মধুমতি ব্যাংকের সাথে আগে থেকে দক্ষিণ সিটির লেনদেন ছিল।  অন্যন্য ব্যাংকে যেভাবে লেনদেন পরিচালিত হয়, মধুমতী ব্যাংকেও একইভাবে দক্ষিণ সিটির লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে।  ব্যাংকের আইন মেনেই করা হচ্ছে।  এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।