৮:৪২ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার | | ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

একটি জীবন্ত কবিতা

‘জেলখানায় সাত দিন’

০৪ আগস্ট ২০২০, ০৮:৪৪


একটি জীবন্ত কবিতা ‘জেলখানায় সাত দিন’

। । সালাম গফফার ছন্দ। । 

দুপুরে লাঞ্চে বসেছি টেবিলে

দু’চার বার মুখে তুলেছি অন্ন,

সহসা শুনতে পেলাম হাক ডাক-

‘মাস্টার সাহেব বাড়িতে আছেন’?

জবাব দেবার আগে হন্তদন্ত হয়ে

সিভিল পোশাকে দুজন-

সোজা এসে হাজির টেবিলের পাশে;

জিজ্ঞেস করি‘আপনারা কে’?

‘আমরা পুলিশ থানা থেকে এসেছি’

জিজ্ঞাসা করি ‘বলুন’?

মারমার হাকডাক রোখে-

উত্তরে বলে, ‘আপনার বিরুদ্ধে-

অভিযোগ আছে থানায় চলেন’। 

কি অভিযোগ জানতে চাইলে বলে-

‘থানায় গেলেই জানতে পারবেন’

ততক্ষণে জ্যেষ্ঠ পুত্র বেড ছেড়ে

উঠে এসেছে দ্বারে, সাথে সাথে

জিজ্ঞেস করে-‘এই তোর নাম কি’?

জবাবে বলে ‘আমার নাম বাবু’

নাম শোনামাত্র সিপাইকে বলে

‘ওঁর হাতে হাতকড়া পরাও’

হুকুম পেয়েই ওঁর হাতে হাতকড়া-

পরাল সেপাই; এস আই শরিফুল

তড়িৎ ন্যায় ঘর থেকে নেমে

জোরে শোরে ফোন করে ‘হ্যালো’

‘বাপ বেটা একসাথে পেয়েছি দুজনকে-

কাকে আনব’? লাউডে শোনা যাচ্ছে

ওর কথা গুলো, বলছে,

‘বাপকে নিয়ে এসো’। 

এস আই শরিফুল উঠে এলো—

আমার পাশে ততক্ষণে খাওয়া

বন্ধ হয়েছে আমার; সিপাইকে বল্ল,

‘ওঁর হাতকড়া খুলে দাও’।  খুলে দিল। 

ধমকের সুরে বল্ল, ‘যা ঘরে যা-

কোথাও যাবিনে যেন’।  এরপর-

ধমকে আমাকে বল্ল-‘খেলে তাড়াতাড়ি খান,

না হলে চলেন আমাদের সাথে থানায়’। 

 মুক হতভম্বের ন্যায় খাওয়া হল না,

হাত ধুয়ে ফেলি উঠে আসি রুমে,

শার্টটা গায়ে দিয়ে চশমাটা পরে

বলি ‘চলুন’; নেমে আসি ঘর থেকে। 

ওদের মোটর সাইকেলটা গেটের

বাইরে পাঁচিলের আড়ালে রাখা,

দুজনের মাঝে আম্মাকে বসিয়ে

দ্রুত চলতে লাগল গন্তব্যে,

তারিখটা ২১ জুলাই ১৯১৫

চাকুরী থেকে অবসর নেবার চারমাসে;

পনর বিশ মিনিট চলা শেষে ওরা

সোজা থানা হাজতে ঢুকায় আমায়। 

আমি ত অবাক! প্রাক্তন ছাত্র কুদ্দুস,

তাঁকেও এনেছে আমার আগে;

রীতিমত হতবাক যেন দুর্বার!

নিষ্প্রাণ হাজত গেটে তাকিয়ে থাকি,

সেন্ট্রি পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহারায়-

এমনি ভাবে কেটে যায় কিছু সময়

নিস্তব্ধ নীরবতায়; একসময়-

জানতে পারি আমি নাকি মানব পাচারকারী!

শুনে হাসলাম; ধিক্কার দেই ওদের;

আর বলি, এই পুরষ্কার পেতে সেদিন

১৯৭১’এ মুক্তি যুদ্ধ করেছিলাম-

এস এস সি পরীক্ষা বয়কট করে!

শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ নবেম্বর ৭৪’এ,

মানুষ গড়েছি সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর;

ধাপে ধাপে এগিয়েছি সততা ভালবাসা নিয়ে-

পদোন্নতি পেলাম সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে,

লক্ষাধিক মানুষ গড়ে কাটিয়ে দিলাম

হাসি কান্নায় চার দশক কাল। 

তারপর অবসর নিলাম ৩১ মার্চ’১৫তে,

কিন্তু এক নিমিষেই পুলিশের থাবায়-

হয়ে গেলাম মানব পাচারকারী?

২২ জুলাই’ ১৫ শুক্রবার এগারটায়

কোর্টে চালান করা হলো;

রাখা হলো কোর্ট হাজতখানায়-

এ সংবাদ ছড়িয়েছিল যেন বাতাসের আগে,

আমাকে দেখতে এলো দুজন। 

মানবরুপী কুত্তা গুলো এলাকা থেকে

পালিয়েছিল নানা অজুহাতে!

বিকালে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে গেল

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে যথারীতি,

ষঢ়যন্ত্রী দালাল চেয়েছিল দেঢ় লাখ;

কিন্তু দিতে রাজি হয়নি কেও বারণ ছিল আমার। 

কারাগারে গেলাম দেখলাম আমার মত

শত সহস্র মিথ্যা ষঢ়যন্ত্রের শিকার;

তাই কারাগারে ওঁদের ঠিকানা আজ,

ভাল লাগল আমার। 

২৩ জুলাই তারিখে পেলাম

উকিল নিয়োগের কাগজ;

উকিল আমারই ছাত্র-

এ্যাডভোকেট আব্দুল অহেদ। 

স্বাক্ষর নিয়ে চলে যায় বাহক-

জেলখানায় এসে ভাল লাগল

পরিবেশ উন্নত অতীতের চেয়ে শুনে,

দেখলাম বুড়ো যুবক শিক্ষিত অশিক্ষিত

আমার মত হাজারে হাজার। 

দেখা হয় তাঁদের সাথে প্রতিদিন

উঠতে বসতে চলতে ফিরতে-

খেতে আর কথা হয়, জানা হয়

সবার উপর জুলুম অত্যাচারের কথা!

যে রুমে আমি থেকেছি সেখানে-

বেশির ভাগ পঞ্চাশ ষাটোর্ধ হাজতি

কেওবা রাজনীতিক নেতা আবার-

কেঊবা স্কুল কলেজ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শিক্ষক। 

একদিন দুদিন তিনদিন শেষে এলো-

আমার আত্মীয় স্বজন আর বন্ধু বান্ধব,

জামিনের সংবাদ শুনিয়ে করে আশ্বস্ত;

পঁচিশ ছাব্বিশ পেরিয়ে গেল-

পরদিন এলো সাতাশে জুলাই’১৫

সকাল দশটায় নোটিশ পেলা জামিনের!

গুছিয়ে বের হতে বলা হল-

শুনে হাসি কান্না পেল আমার;

ধিক্কার দিয়ে বলি, হায়রে দেশ-

এ প্রাপ্যই পেতে সেদিন

১৯৭১’এ ন’মাস যুদ্ধ করেছিলাম-

মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে;   

স্বীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে!   

ভাবতে ভাবতে আমি পুট্টলিটা নিয়ে

কারাগারের প্রধান ফটকে; নিয়ম

পালন শেষে সোজা এলাম গেটে

গেট খুলে দিল বলল, ‘সোজা চলে যান-

ডানে বায়ে না তাকিয়ে’।  মনে আমার যেন

অজানা শঙ্কা; বহির্গেটে কি আবার আটকাবে!

এমনটি হচ্ছে অহরহ এ কারাগারে

রাজনীতিক বা কর্মী হলে বিপদ;

দুদিন আগেই ঘটেছে এমন ঘটনা-

বিশেষত জামাত কিংবা বিএনপি হলে। 

গেট দিয়ে দ্রুত হেটে চলে এলাম

কোন দিকে না তাকিয়ে পুলিশের কথামত,

সোজা পশ্চিমের প্রবেশ বাহির ফটক-

পেরিয়ে মুক্তবাতাস টেনে নিলাম শূন্য বুকে!

২৭ জুলাই’১৫ আমার জীবনের এক স্মরণীয় দিন

তিক্ত অভিজ্ঞতার সোনালী অধ্যায়-

এ যেন এক জীবন্ত কবিতা জীবন-বৃন্তে;

এরপর এলো কোর্টে হাজিরা দেওয়ার পালা-

পনর ষোল সতর আঠার ঊনিশ গেল

এলো জানুয়ারী’২০ তারপর ফেব্রুয়ারীর

চব্বিশ তারিখ আসামীর কাঠগড়ায়

দাড়িয়েছি, সহসা জেলা দায়রা জজ

নাম ধরে ডাকলেন আমাকে;

আমি হাত উঠিয়ে সম্মান জানাতেই

রায় পড়ে শোনালেন ‘আপনাকে মামলা থেকে-

অব্যাহতি দেয়া হলো’।  রায় শোনা শেষে

মুখ থেকে আমার অস্পষ্ট বের হয়ে এলো

‘আলহামদু লিল্লাহ’; দুচোখে ভরে এলো

অশ্রু; সংবরণ করে নেমে এলাম-

কাঠগড়া থেকে ধীরে ধীরে!

বুকটা খালি হয়ে গেল; মনে হলো-

নেমে গেল যেন এক জগদ্দল পাথর!

মুহূর্তে ছড়িয়ে গেল খবরটা বাতাসের আগে-

চারপাশের পৃথিবীতে উল্কা সম!

##########