৩:১৮ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার | | ৪ সফর ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

ডাকাতিয়া নদী যেন এক অপরূপ সৌন্দর্যের আঁধার!

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:২২


ঋতু পরিবর্তনে নীল আকাশের নিচে অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ নিয়েছে কুমিল্লার বৃহত্তর লাকসামের ঐতিহ্যের ডাকাতিয়া নদী।  বর্ষার পানিতে যৌবন ফিরে পেয়েছে নদীটি।  গ্রামীণ জনপদে প্রকৃতি যেন বিলিয়ে দিয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা আর অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য।  সৌন্দর্যের ষোলোকলায় পরিপূর্ণ নদীটি ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ দেয়।  নদীতে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের মাছ আর বোরো মৌসুমে নদীতে থাকা পানি কৃষিকাজে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করে। 

ডাকাতিয়া বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী।  নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৭ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬৭ মিটার (২২০ ফুট)।  এটি মেঘনার একটি উপনদী।  ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগসারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে চাঁদপুর ও লক্ষীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।  নদীটি কুমিল্লার লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ, চাঁদপুরের শাহরাস্তি ও হাজীগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে চাঁদপুর মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে।  নদীটির ধরণ প্রকৃতি সর্পিলাকার। 
ডাকাতিয়া নদীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে।  এ নদী দিয়ে একসময় মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় প্রবেশ করত এবং নদীতে ডাকাতি করত।  ডাকাতের উৎপাতের কারণে নদীটির নাম ডাকাতিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।  আবার কারো কারো মতে, ডাকাতিয়া নদীর করাল গ্রাসে দুই পাড়ের মানুষ সর্বস্ব হারাত।  জীবন বাঁচাতে ডাকাতিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে বহু মানুষের সলিলসমাধি রচিত হয়েছে।  ডাকাতের মতো সর্বগ্রাসী বলে এর নামকরণ হয়েছে ডাকাতিয়া নদী। 
ডাকাতিয়া খনন না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদীটি যৌবন হারালেও বর্ষা মৌসুমে নদীটির সৌন্দর্য ফিরে এসেছে।  ডাকাতিয়ার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট অংশের বেশিরভাগ স্থান এখন ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ দেয়।  নীল আকাশের নিচে নদীটি সেজেছে বর্ণিল সাজে।  ডাকাতিয়া এখন পানিতে টুইটুম্বর।  দেখতে চোখজুড়িয়ে যায়।  এ সময়ে নদীর সৌন্দর্য দেখতে গ্রামে ছুটে আসেন যান্ত্রিক শহরে থাকা মানুষগুলোও।  তারা মনের আনন্দে ছুটে যায় ডাকাতিয়ার পানে।  দলবেঁধে অনেকে নৌকাযোগে দূর-দূরান্ত ছুটে যায়।  অনেকে নদীর বুকেই করে বনভোজনের আয়জন।  রাতে বেলায় শীতল বাতাস ডাকাতিয়ার গর্জন পথচারীদের উদ্বেলিত করেন।   

সম্পদ, সম্ভাবনা আর অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের হাতছানি ডাকাতিয়া বর্ষা মৌসুমে রূপ ছড়িয়ে দিলেও পানি কমার সাথে সাথে ডাকাতিয়া সৌন্দর্য হারাতে থাকে।  দখলদাররা ডাকাতিয়ার পাড় দখল ও মাটি কেটে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।  এছাড়া, বিভিন্ন স্থানে কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলে বিষাক্ত করে তোলা হয়।  নদী তীরের আশে-পাশের বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়ে নানা রোগ ব্যাধি ছড়ায়।  দীর্ঘ কয়েকবছর খনন না করায় কোথায়ও কোথায়ও মরাখালো পরিণত হয়।  তখন নদীটির সুফল বঞ্চিত হয় নদী এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ী সহ ভ্রমণ পিপাসুরা। 

লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোটের বিভিন্ন স্থানে অপার সম্ভাবনার ডাকাতিয়া নদীকে দখলমুক্ত করে খনন করে বছর জুড়েই দর্শনীয় করতে স্থাণীয়রা দাবি জানিয়ে আসলেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।  ২০১৯ সালের ২ মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ডাকাতিয়া নদীর দুই তীর পরিদর্শনে এসে খনন ও উচ্ছেদ অভিযান শুরুর ঘোষণা দিলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।   
তবে, এলজিআরডি মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম এমপি’র আন্তরিকতা ও তৎপরতায় ডাকাতিয়ার নাব্যতা ও জৌলুস ফিরে আসার বিষয়ে আশার আলোর দেখছেন নদী এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা।  মন্ত্রী নদীটির নাব্যতা ফিরে আনার পাশাপাশি নদীর দুই তীরকে দৃষ্টিনন্দিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছেন।  এরই প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ডাকাতিয়া নদীর লাকসাম অংশে পরিদর্শনে আসেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। 
পরিদর্শকালে পূর্বের ন্যায় ডাকাতিয়ার নদীর নাব্যতা ও জৌলুস ফিরে আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সচিব জানান, নির্বিঘ্ন নৌ-চলাচলের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, সেচ সুবিধার মাধ্যমে কৃষকরা যাতে নদীটির সুফল ভোগ করতে পারে এজন্য শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।  এলজিআরডি মন্ত্রীর উদ্যোগ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্যে আশান্বিত বৃহত্তর লাকসামের মানুষ।  তাদের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে ডাকাতিয়া হবে সম্পদের ভান্ডার, অফুরন্ত সম্ভাবনা আর অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত।