১১:০৬ পিএম, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, মঙ্গলবার | | ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনের আগেই চুরি!

০৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:২১


একের পর এক প্রযুক্তির সুবাদে পাল্টে যাচ্ছে জীবনধারা, পাল্টে যাচ্ছে শহর-নগর-বন্দরের রূপ-রীতি।  রাজধানী ঢাকার রাজপথও এর ব্যতিক্রম নয়।  মহানগরীর সড়কগুলোতে যেসব ইন্টারসেকশন রয়েছে, সেগুলোতে চলমান ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি স্থাপনের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০০২ সালে।  কিন্তু এর পর ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি; কয়েক দফায় শুধু প্রকল্পই হাতে নেওয়া হয়েছে। 

সর্বশেষ সংবাদ, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আপাতত রাজধানীর চারটি স্থানে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি বা ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম (আইটিএস) চালুর প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।  ধীরগতিতে হলেও প্রকল্পটি এগোতে থাকে।  একপর্যায়ে অনেকটাই গুছিয়ে আনা হয় প্রকল্প; যন্ত্রপাতি চালুর জন্য প্রস্তুতির পর তালাশ করা হয় এ সংক্রান্ত সফটওয়্যারটির, যেটি কিছুদিন আগে আমদানি করে গোডাউনে রাখা হয়েছিল। 

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, গোডাউন থেকে চুরি হয়ে গেছে সফটওয়্যারটি! স্থাপনের আগেই! ফলে ১৮ বছরের অপেক্ষার পরও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি জ্বলল না দেড় কোটি মানুষ অধ্যুষিত এ শহরে।  বরং পুরো প্রকল্পে জ্বলে উঠল এক অদৃশ্য লালবাতি। 

এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে আইটিএস সরঞ্জাম।  এগুলোও চুরির আশঙ্কা করা হচ্ছে।  তাই দ্রুত ডিএমপির কন্ট্রোল রুমে স্থাপনের জন্য সফটওয়্যার সংবলিত সার্ভার কম্পিউটার কেনার জন্য প্রকল্পের বিশেষ সংশোধনের প্রস্তাব করেছে ডিটিসিএ। 

৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা খরচ করে ঢাকার চারটি ইন্টারসেকশনে স্বয়ংক্রিয় এই ট্রাফিক সিস্টেম বসানোর কথা ছিল।  পল্টন, ফুলবাড়িয়া, মহাখালী ও গুলশান ১-এ সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।  এখন নতুন করে এ প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।  এক খাতের খরচ অন্য খাতে সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

সূত্রমতে, জাপান থেকে কেনা আইটিএস প্রকল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম দেশে আসে ২০১৯ সালের নভেম্বরে।  এ চুরি যাওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে।  সে সময় এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।  তবে শেষ মুহূর্তে সফটওয়্যার গোডাউন থেকে খুঁজে না পাওয়ায় কাজ এখনো আটকে আছে। 

গত বছরের জানুয়ারি থেকে আইটিএসের ‘ট্রায়াল’ ও ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ কাজ শুরু করে জাপানের বিশেষজ্ঞ দল।  আইটিএসের ওপর মোট ছয়টি অ্যাকশন প্ল্যান, গাইডলাইন ও ম্যানুয়াল ডিটিসিএর কাছে হস্তান্তরের কথা।  পরে সিস্টেমটি ডিটিসিএ হস্তান্তর করবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাছে।  তখনই প্রয়োজন হয় গোডাউনে রাখা আইটিএস সফটওয়্যার ও বিশেষায়িত কম্পিউটারগুলো।  তবে গোডাউনে গিয়ে সেগুলো আর খুঁজে পাননি ডিটিসিএর কর্মকর্তারা। 

জানা গেছে, ঢাকার চার ইন্টারসেকশনে আইটিএস চালুর অংশ হিসেবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা, ভেহিকল ও ইমেজ ডিটেক্টর, সিগন্যাল বাতি লাগানো হয়।  জাপান থেকে আসে আইটিএস সফটওয়্যার সংবলিত দুটি বিশেষ কম্পিউটার।  তবে সেগুলো স্থাপনের আগেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন হাজারীবাগ এলাকার একটি ভাড়া করা গোডাউন থেকে চুরি হয়ে গেছে।  সব কাজ শেষ হলেও শুধু সফটওয়্যারের অভাবে অলস পড়ে থাকে চার ইন্টারসেকশনে স্থাপন করা আইটিএস প্রকল্পের সরঞ্জাম। 

সফটওয়্যার চুরির ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় মামলা হয় ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি।  এর পর বিষয়টি জাইকাকে লিখিতভাবে জানানো হয়।  চুরি যাওয়া সফটওয়্যার সংবলিত কম্পিউটারটি দিতে জাইকাকে অনুরোধ করলে তারা সেটি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।  ফলে আমদানি করা দুই বিশেষ কম্পিউটারের একটি এখন অকেজো।  বলে রাখা ভালো, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় করার পর এসব সরঞ্জামের একটি প্যাকেটে দুটি অত্যাধুনিক কম্পিউটারসহ আইটিএস সফটওয়্যার রাখা ছিল।  প্যাকেটের গায়ে ছিল জাইকার কোড।  প্রকল্পের কাজে নিযুক্ত জাপানের প্রকৌশলীদের প্যাকেটটি খোলার কথা।  এদিকে সফটওয়্যার চুরির বিষয়টি বর্তমানে তদন্ত করছে ডিবি।  আর ডিটিসিএর অভ্যন্তরীণ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। 

প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, নতুন করে সফটওয়্যার আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।  কিছুদিনের মধ্যেই এসব কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদী।  কম্পিউটার হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই হয়তো এগুলো চুরি করা হয়েছে।  তবে এগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডিটিসিএর সিগন্যাল বাতির জন্য আইটিএস প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৬ সালে।  শুরুতে এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩৭ কোটি টাকা।  দুই দফায় বাড়িয়ে যা সর্বশেষ ৫২ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা হয়েছে।  কাজ শেষ করার মেয়াদও কয়েক দফা বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত।  দুই দশকে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও সিগন্যাল বাতিতে নয়, ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুলিশের হাতের ইশারায়। 

এর আগে ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকার অন্তত ৭০টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল বাতি বসানো হয়।  রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এক বছরও টেকেনি এসব বাতি।  এর পর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আরেক দফায় বসানো হয় সিগন্যাল বাতি।  সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেনা হয় রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম।  তা ছাড়া বনানী থেকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত ১১ পয়েন্টে আলাদা করে বসানো হয় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি।  শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে আসাদ অ্যাভিনিউতে পথচারী পারাপারের জন্য বেশ ঘটা করে পুশ বাটন উদ্বোধন করেন উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র।