১:১৪ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার | | ৪ সফর ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

প্রবাসে কাজ হারিয়ে ফেরত এসেছেন লাখো বাঙালী

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:০৭


বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেশির ভাগের দিন কাটছে মানবেতরভাবে।  অনেকের ভাগ্যে দু’বেলা খাবারও ঠিক মতো জুটছে না।  এদের মধ্যে অনেকে আবার দালালের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা খুইয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে আছেন জেলে।  পরিস্থিতি দিন দিন অস্বাভাবিক হতে থাকায় উপায় না পেয়ে অসহায় এসব প্রবাসী নিজের পকেটের টাকায় বিমানের টিকিট কেটে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।  করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যসহ শ্রমবান্ধব দেশগুলো থেকে বেকার থাকা শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসছেন। 

৫ মাস ১২ দিনের ব্যবধানে সৌদি আরব, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবাননসহ মোট ২৮টি দেশ থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার ২০৯ জন শ্রমিক ফেরত এসেছেন।  যাদের বেশির ভাগ ওই দেশগুলোতে কাজ হারিয়ে, চুক্তি শেষে ও অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে কারাভোগ শেষে দূতাবাস বা হাইকমিশনের দেয়া আউট পাসে দেশে ফেরত এসেছেন বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 

ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকদের তালিকার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থায় রয়েছে সৌদি আরব।  দেশটি থেকে এসেছেন ৩০ হাজার ৫৩১ জন শ্রমিক।  এরপরের স্থানে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।  এখন পর্যন্ত দেশটি থেকে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ফেরত এসেছেন ৩৬ হাজার ৫৩৩ জন।  তৃতীয় স্থানে আছে কাতার।  দেশটি থেকে এসেছে ১০ হাজার ৫৩৫ জন।  এরপরের অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপ, ওমান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ইরাক, লেবানন জর্দান, লিবিয়া, ইতালিসহ মোট ২৮ দেশের শ্রমিকরা। 

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ এপ্রিল থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিদেশফেরত কর্মীদের একেক দেশ থেকে একেক ধরনের কারণে ফেরত এসেছেন বলে মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।  তার মধ্যে বেশির ভাগ শ্রমিক ফেরত আসার কারণ ‘কাজ নাই’ বলা হলেও মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে সেই সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়নি। 

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সৌদি আরব থেকে কর্মীদের ফেরত পাঠানোর কারণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউট পাসে এবং অনেকে কাজ হারিয়ে বা ছুটিতে দেশে এসেছেন।  মালদ্বীপের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ট্যুরিস্টনির্ভর হওয়ায় করোনার কারণে কাজ নেই, তাই মালিক বা কোম্পানি ফেরত পাঠিয়েছে।  সিঙ্গাপুরের মন্তব্যে বলা হয়েছে, কাজের বা চুক্তির মেয়াদ শেষে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। 

ওমান থেকে যারা ফিরেছেন তাদের কারণ বলা হয়েছে, বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউট পাসে ফেরত এসেছেন।  কাতার, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও মরিশাসে কাজ না থাকার কারণে শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হয়। 

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যেসব শ্রমিক দেশে ফিরেছেন তাদের ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কথা বলে ফেরত আসার কারণ জানা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গতকাল বিকেলে সৌদি আরবে অবস্থানরত ঢাকার ‘লাব্বাইক ট্র্যাভেলস’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে যাওয়া শ্রমিকদের কয়েকজন হোয়াটসঅ্যাপে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এখানে আসার পর থেকেই কষ্টের মধ্যে আছি।  আমাদের দ্রুত উদ্ধার করার ব্যবস্থা করেন।  ইতোমধ্যে অনেকে টিকতে না পেরে পালিয়ে গেছে।  আমাদেরকে বন্দী করে সিকিউরিটি বাড়িয়ে মালিক কাজ করাচ্ছে।  কিন্তু ঠিকমতো বেতন দিচ্ছে না।  যারা পালিয়ে গেছে তাদের অনেকে দেশ থেকে টিকিটের টাকা এনে ফেরত গেছেন বলে শুনেছি।  খাবারের কষ্ট চলছে। 

শুধু সৌদি আরব নয়, একই অবস্থা বিরাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননেও।  সেখানে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক শ্রমিক।  ঠিকমতো দু’ বেলা খাবারও নাকি খেতে পারছেন না।  অনেকের পরিবারের এসব কষ্টের কথা শুনে দেশ থেকে বিমানের ভাড়ার টাকা পাঠাচ্ছেন। 

এরপরই সিরিয়াল দিয়ে বিমান টিকিট কেটে দূতাবাসের হস্তক্ষেপে তারা দেশে ফিরছেন।  সর্বশেষ গত সপ্তাহে ৪১২ জন শ্রমিক বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। 

গতকাল বিকেল ৫টায় মহিলাকর্মী প্রেরণকারী সংগঠন ‘ফোরাব’-এর সাবেক সভাপতি ও রিক্রুটিং এজেন্সি ঐক্য পরিষদ নামের সংগঠনের বর্তমান সভাপতি টিপু সুলতান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মূলত বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণে বিদেশ থেকে শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসছেন।  এটি রোধ করার জন্য আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ানো হলে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো থেকে কর্মী ফেরত আসার হার কমে যাবে বলে আমি মনে করি। ’

গতকাল বিকেলে জনশক্তি প্রেরণকারী ব্যবসায়ীদের একমাত্র সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ অব বাংলাদেশের (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান নয়া দিগন্তকে বলেন, যাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং যারা আনডকুমেন্ট ছিলেন তারাই ফেরত চলে এসেছে।  এ ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিজের কারণে জেলহাজতে ছিলেন তারাও ফেরত এসেছেন। 

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সেদিন পার্লামেন্টকে আশ্বস্ত করেছেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের অক্লান্ত চেষ্টার কারণে যেভাবে কর্মী আসার আশঙ্কা করা হচ্ছিল সেভাবে কর্মী না আসার কথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। 

তিনি বলেন, আমরা আশা এবং বিশ্বাস করি, যেসব দেশে আমাদের দেশের কর্মীরা কর্মরত আছেন, সেই সব দেশের সরকারের কঠিনভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করায় তাদের করোনার অবস্থা অনেকটা উন্নতি হয়েছে।  সে কারণে সেই সব দেশগুলোতে নরমাল অ্যাকটিভিটিজ ক্রমান্বয়ে ফিরে আসছে।  তারা যত নরমাল অ্যাকটিভিটিজে ফিরে আসবে ততই দ্রুত আমাদের কর্মীদের আবার কাজে যোগদানের ব্যবস্থা আরো গতিশীল হবে।  সেই সব বিবেচনায় আমরা আশা করব আমাদের কর্মীরা ফের কাজে যোগদান করতে পারবেন। 

বর্তমানে যারা দেশে ছুটিতে এসে আটকা পড়েছেন এবং বায়রার কাছে যে নতুন এক লাখ কর্মীর ডিমান্ডের তালিকা রয়েছে সে ব্যাপারে বায়রা মহাসচিব নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ব্যাপারে আমরা এখনো পরিষ্কার কিছু জানতে পারিনি।  তবে আমরা আশা করছি আগামী মাসে (অক্টোবরে) একটি নির্দেশনা আসবে।  এটি একটি পজিটিভ দিক।  আর ভয়ের দিক হচ্ছে, আমাদের দেশের বর্তমান যে করোনা পরিস্থিতি আছে সেটি যদি আমরা নিয়মের মধ্যে দিয়ে কন্ট্রোল করতে না পারি তাহলে আগামীতে তারা দরজা খুলে দিলেও আমাদের দেশের কর্মী পাঠানো অনেক কঠিন হয়ে যাবে।  কারণ তারা যে আইন কানুন চালু করছে এগুলো মেইনটেন করে শ্রমিক পাঠানো খুব কঠিন হবে।  সে ক্ষেত্রে আমাদেরও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।  যাতে আমরাও আমাদের দেশের এই পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারি। 

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের বায়রার মোট ১৪০০ মেম্বার আছে।  বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এক লাখ ভিসা প্রক্রিয়াধীন আছে।  এই সেক্টরে যারা কর্মরত আছেন, তারা (এজেন্সি) ১৫ শ’ কোটি টাকার মতো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।  এই কর্মী প্রেরণ করতে না পারলে এই ক্ষতি সামলানো এবং সেক্টরকে রিভাইভ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। 

আমরা এই কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজ বা প্রণোদনার জন্য আবেদন করেছি।  আমরা আশা করি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান সেক্টরটিকে আগামীতে আবার চালু করার ক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে দেবেন বলে আমরা আশা রাখি।