১২:৪২ পিএম, ২৩ জানুয়ারী ২০২১, শনিবার | | ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

বাংলাদেশ ব্যাংক দায় এড়াতে পারে না

০৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:৩৪


দেশের শত শত কোটি টাকা পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়-দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট।  আদালত বলেন, বিদেশে শত শত কোটি টাকা পাচার হচ্ছে।  বাংলাদেশ ব্যাংক কী করছে? এত কিছু হচ্ছে তারা (বাংলাদেশ ব্যাংক) কিছু করছে না কেন? তারা শুধু ওখানে (অফিসে) এসে বসে থাকবেন, কিছু করবেন না তা তো হয় না।  বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থপাচারের দায় এড়াতে পারে না। 

প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) ৩ হাজার ৬শ’ কোটি হাতিয়ে নেয়ার মামলায় ভুক্তভোগীদের আবেদনের শুনানিকালে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি আহমেদ সোহেলের ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ এসব মন্তব্য করেন।  শুনানিতে পি কে হালদারের সহযোগী ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। 

এর আগে গত ৩ জানুয়ারি মামলার পক্ষভুক্ত বিনিয়োগকারী সামিয়া বিনতে মাহবুব ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আদালতে বলেন, আমরা যে কোনোমূল্যে টাকা ফেরত চাই।  এ জন্য যা যা করা দরকার তাই করব।  পি কে হালদারের মা লিলাবতী হালদার ও অবন্তিকা বড়ালসহ সকলকে আটক করলেই পি কে হালদারকে ফেরানো সম্ভব হবে।  এ জন্য আমরা আদালতের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।  এ আমানতকারী কান্না বিজড়িত হয়ে বলেন, আজ আমি একজন ক্যান্সারের রোগী।  আমার এখন আর চাকরি নেই।  করোনা আসার পর থেকে আমার স্বামীরও চাকরি নেই।  আমি আর আমার স্বামী মিলে আমাদের জীবনের কষ্টার্জিত টাকা পিপলস লিজিং-এ আমানত রেখেছিলাম।  এখন আমারা আমাদের টাকা পাচ্ছি না! এতটা অসহায় হয়ে গেছি যে, এবার বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি।  গত ১ বছর বাচ্চাদের একটু মাছ মাংস খাওয়াতে পারিনি।  আমারা আর্থিক-মানুষিক কষ্টে মারা যাচ্ছি।  আমারা এখন কার কাছে যাব? আপনাদের কাছে আকুল আবেদন আমাদের বাঁচান। 

ভিডিও লিংকে যুক্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে সঙ্গীত শিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল আদালতে বলেন, আমার বাবা এবং আমিসহ পরিবারের ৫ জন পিপলস লিজিং-এ টাকা আমানত রেখেছি।  আমরা সরল বিশ্বাসে আমাদের টাকাটা রেখেছিলাম।  আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি পি কে হালদার এখান থেকে টাকা নিয়ে গিয়েছে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং।  তাই এখানকার আমানতকারী হিসেবে আমি-আমারা-আমাদের টাকাটা ফেরত চাই।  বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মো. শওকতউর রহমান হাইকোর্টকে বলেন, দেশটা কি স্বাধীন করেছিলাম এভাবে নিজে প্রতারিত হওয়ার জন্য? আমি আমার আমানতের টাকাটা ফেরত চাই। 

আমানতকারীদের আইনজীবীরা ওইদিন আদালতকে জানান, পি কে হালদারের কারণে ধারাবাহিক লোকসানে থাকা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং ২০১৪ সালের পর থেকে আমানতকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।  আবার ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ।  একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।  কিন্তু এতেও প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থার উন্নতি না হলে গত বছরের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।  এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত পৃথক রিটের এক আদেশে বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক বেঞ্চ ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন’ মর্মে পর্যবেক্ষণ দেন।  গত ৪ জানুয়ারি ওই আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়।  তাতেও হাইকোর্ট বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য সরকার প্রধান যেখানে ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিশেষ করে নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্ণর, ডিজিএম ও জিএমরা ঠগবাজ, প্রতারক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন।  ব্যক্তি স্বার্থে আর্থিক খাতের এই বিপর্যয়ের জন্য তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। 

আদালত আরও বলেন, ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।  দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা।  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ঠগবাজ ব্যবসায়ী, প্রতারকরা যাতে জনসাধারণের অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে, বাংলাদেশে ব্যাংকের গভর্ণরকে সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে।  দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এদের গোপন আঁতাত, পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে হবে। 

বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।  গত বছর প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি পৃষ্ঠপোষক অংশীদার ‘টিজ মার্ট ইনকর্পোরেটেড’ অর্থ আত্মসাৎ, অব্যবস্থাপনাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ আনে বিআইএফসি পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।  এসব অভিযোগে বিআইএফসি চেয়ারম্যানের অপসারণ, নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিল টিজ মার্ট।  সেই সঙ্গে পি কে হালদার সংশ্লিষ্ট ‘সুকুজা ভেঞ্চার লিমিটেড’ ও ‘কাঞ্চি ভেঞ্চার লিমিটেড’ কীভাবে বিআইএফসির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হয়েছে।  সেজন্য এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাইবাছাই করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়। 

আদেশে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীকে বিআইএফসির চেয়ারম্যান ও স্বাধীন-স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগের কথা বলেন আদালত।  তিনি পরিচালনা পর্ষদ এবং বার্ষিক সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করবেন।  এছাড়া সাবেক সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জামিল শরীফ, আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি মো. মাহামুদ হোসেন ও মো.শাহাদাত হুসাইনকে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।  এই আর্থিক সংস্থার নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য নিরীক্ষক কোম্পানি নূরুল ফারুখ হাসান অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।  এই নিরীক্ষক কোম্পানি বিআইএফসির বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় খতিয়ে দেখবে।  আগামী ২২ ফেব্রæয়ারি এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। 

এদিকে হাইকোর্টের একক বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগীদের নাম প্রকাশ করা না হলেও গতকাল মঙ্গলবারের আদেশে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়।  এসব নামের একটি হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর এস. কে. সুর।  এছাড়া মাহবুব মুসা, এ কিউ সিদ্দিকী, মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পি কে হালদারের মা লীলাবর্তী হালদারের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারা বিভিন্ন সময় তথ্য দিয়ে পি কে হালদারকে সহযোগিতা করেন। 

অভিযোগ রয়েছে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে হরিলুট এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উল্লেখিত এসকে সুরের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।  বিভিন্ন শিল্পপরিবারের সাথে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রেখে নানামুখি সুবিধা নিয়েছে এই এস. কে. সুর।  কথিত রয়েছে, ডেপুটি গভর্ণর হিসেবে নিয়োগ লাভের সময় এসকে সুর প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা নিয়েছেন।  এমনকি ডেপুটি গভর্ণরের দায়িত্ব পালন শেষে একই প্রক্রিয়ায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে নেন।  ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সময় তার ভূমিকা ছিলো সন্দেহজনক।  তারই পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ভারতীয় আইটি ব্যবসায়ী রাকেশ আস্তানাকে।  রাকেশ আস্তানার সফট অয়্যারই ব্যবহার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের পক্ষে শুনানি গ্রহণ করে গতকাল হাইকোর্ট পি কে হালদারের ২৫ সহযোগীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।  দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে বলে জানান সংস্থাটির কৌঁসুলি খুরশিদ আলম খান।  নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তিরা হলেন, ‘ফার্স্ট ফিন্যান্স’র হারুনূর রশিদ, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সামি হুদা, অমিতাভ অধিকারী, অবন্তিকা বড়াল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মিস শামীমা, একই প্রতিষ্ঠানের মিস রুনাই, আই খান, আয়কর আইনজীবী সুকুমার মৃধা, তার স্ত্রী অনিন্দিতা মৃধা, তপন কুমার দে, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অভিজিৎ চৌধুরী, রাজীব সোম, ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফান উদ্দিন আহমেদ, অঙ্গন মোহন রায়, নঙ্গ চৌ মং, নিজামুল আহসান, মানিক লাল সমাদ্দার, সোহেল শামস। 

প্রসঙ্গত: পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে দেশত্যাগ করেন পি কে হালদার।  এ বিষয়ক মামলায় প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা তাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন জানান।  সরকারপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন মানিক।  দুদকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান।  আদেশের পর তিনি জানান, টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে বিদেশে যাওয়া পি কে হালদারের প্রতারণায় সহায়তাকারী ২৫ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।  এই ২৫ জনকে প্রয়োজনে দুদক জিজ্ঞাসা করতে পারবে মর্মেও আদেশ দেন আদালত।