৬:৪০ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার | | ১ সফর ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

-সালাম গফফার ছন্দ

“মুজিবের কন্ঠ” (কাব্য)

১০ আগস্ট ২০২০, ০৯:০৯


“মুজিবের কন্ঠ” 

কবিতা-১   

“মুজিবের কন্ঠ”

অরুণ রবির শুভ্র গলে শেখ মুজিবের কন্ঠ দোলে,

মধুর ভাষে ভাষিত আজি সত্যের ডাকে বিশ্ব ভোলে। 

অত্যাচারীর মুখোশ আজি পড়লো বুঝি খুলে,

দিকে দিকে ছুটল সবাই মৃত্যু ভয়কে ভুলে। 

এপার ওপার বাংলা বুঝি একই বাংলাদেশ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর চির দীনের বেশ। 

বাংলা মায়ের দুঃখ কষ্ট মোচন করতে শেখ মুজিব,

অত্যাচারের কবর দিতে তাইত তুমি হলে সজীব। 

নোতুন যুগের নোতুন আলো ছড়িয়ে দিলে দিকে দিকে,

উজ্জ্বল আলোয় ভরবে তুমি মোদের সোনার বাংলাটিকে। 

বাঙ্গালী মোরা বাংলা ভাষায় বাংলাতে তাই কথা বলি,

বাঙ্গালী জাতির মুক্তির তরে মুজিব জেলে গেলেন চলি। 

২২/০৩/১৯৭১

২) 

‘শেখ মুজিব’

জন্মনিয়ে এসেছিলে বাঙ্গালীর ঘরে শেখ মুজিব,

ন্যায় নিষ্ঠা স্বার্থ ত্যাগী এ যে মহান মহিমা শিব। 

ছোট্ট বেলায় তুমি ছিলে সোহরাওয়ার্দীর অতি প্রিয়,

তাই তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন তুমি হবে স্মরণীয়। 

সেই দোয়া বুকে নিয়ে বাঙ্গালীর মুক্তির জন্য,

আজ বাঙ্গালীর মুক্তি এনে হলে যে সবার ধন্য। 

আইয়ুবের শাসন সবার তরে জ্বালিয়েছিল অগ্নি,

সে আগুন নিভাতে তুমি জ্বালিলে সংগ্রাম বর্হ্নি। 

সেদিন অন্যায়’র প্রতিবাদ দেখে ওরা তোমায় করিল বন্দি,

মুক্তি দিবে এক শর্তে যদি কর ওদের সাথে দালালির সন্ধি। 

তবুও বলেছ তুমি ‘না এ মুক্তি আমারই নয়,

সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর মুক্তি সবার জয়। 

এরপর আইয়ুব ঠেলে দিয়েছে তোমায় মৃত্যু গুহায়,

মুখে সত্য বুকে কোরআন আল্লাহ ছিলেন সহায়। 

দানবের সে কঠিন রশি পারেনি তোমা’ বেঁধে রাখতে,

তিরিশ লক্ষ বীর হয়েছে শহীদ মুক্তির সংগ্রামেতে। 

বাঙ্গালীর ঘরে তোমার মতো ফুটেছল শত কলি,

ইয়াহিয়া আয়ুব বাঙ্গালীর বুকে চালালো তাই গুলি। 

বাংলার বুকে বয়েছিল তাই রক্তের খুন স্রোত,

মুক্তি পেয়ে শহীদের তরে করেছিলে মাগফেরাত। 

তুমি ন্যায়, তুমি নির্ভিক তুমি মহান চির উদীয়মান,

এক খোদাকে ছাড়া কর’নিকো ভয় আছো দণ্ডায়মান। 

সেদিন তোমায় হত্যার লাগি ইয়া’ আয়ুব দানব,

শত শত চেলা দিয়ে মৃত্যু জাল পেতেছিল মানব। 

সে চেষ্টা তার ব্যার্থ হলো নিষ্ঠুর নীচ কুক্কুর,

তেইশ বছরে বাংলার বুকে ধরিয়েছিল ভঙ্গুর। 

তুমি তাই বঙ্গ মাকে রক্ষায় হয়ে উঠেছিলে সজীব,

বঙ্গ মাতা হেসে বলে তাই আমার ছেলে মুজিব। 

০২/০১/১৯৬৮ সাল। 

(৩)

“বাংলা ছাড়”

বাংলা মায়ের রঙিন বাগে একটি ফুল ফুটলো বুঝি,

অন্ধকারের বন্ধ হ’তে বাঙ্গালীরা পথ পেলো খুঁজি। 

দূর হতে আজ দূরান্তরে ছুটছে আজ নিশান নিয়ে,

মুজিব মুজিব কন্ঠে ধ্বনি নতুন আলোর পথ বেয়ে। 

ছাড়’ ছাড়’ বাংলা ছাড়’ কন্ঠে নিয়ে বজ্র ধ্বনি,

শোষণের কবর দিয়ে উড়িয়ে দিলে জয় কেতনী। 

ফিরে যা তোরা জীবন নিয়ে সাবধান! হানাদার!

জেগেছে আজি বাঙ্গালী জাতি নাই বুঝি নিস্তার!

ভণ্ডামির মুখোস পরেই করেছ শুধু অভিনয়,

ছাড়’ ছাড়’ বাংলা ছাড়’ মৃত্যু তোদের এসে যায়। 

এসো বাঙ্গালী ছুটে যাই রণে আমরা বিজয়ী বীর,

পশ্চিমা কুত্তা বাংলা ছাড়’ কভূমোরা নোয়াইবনা শির। 

১৭/০৮/৭১ সাল। 

(৪)

“দুর্জয় শফত”

এবার মোদের ডাক এসেছে বাঁচার সংগ্রাম করতে হবে,

দুর্জয় কপাট শৃঙ্খল ভেঙ্গে শত্রুকে খতম করতে সবে। 

সংগ্রাম আজি মুক্তির লাগি দিকে দিকে জ্বলছে আগুন,

সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীরা উড়িয়ে দেব জয়ের কেতন। 

দিকে দিকে ভেসে চলে শেখ মুজিবের বজ্র কন্ঠ,

অত্যাচারীর গুড়িয়ে মাথা ধরব সে ন্যায়ের দণ্ড। 

তেইশ বছরের শাসনে মোরা পেয়েছি সব বুলেট গুলি,

বাঙ্গালীরা তা যাইনিক’ ভুলি তোমাদের সে মিথ্যা বুলি। 

আমাদের রক্তে গড়েছ প্রাসাদ কিনেছ বন্দুক কামান গুলি,

মোদের অস্ত্রে মেরেছ মোদের ভেঙেছ শত মাথার খুলি। 

সেদিন আর বেশী দূরে নয় হব’ মোরা আবার স্বাধীন,

মোরা বাঙ্গালী ভাঙ্গব কারা থাকব নাক’ আর পরাধীন। 

পঁচিশে মার্চে করেছ হত্যা লাখ লাখ বাঙ্গালী সন্তান,

শহীদের দরজা পেয়েছে তারা জ্বেলেছে দীপ্তি অনির্বাণ। 

শেখ মুজিবের অগ্নি মন্ত্রে জেগেছি মোরা বাঙ্গালী,

নব দিগন্তে উঠেছে সূর্য বিজয়ীর রঙে রাঙ্গালী। 

টিক্কা ইয়া আইয়ুব তোরা ভালো করে শুনে নাও,

তিলে তিলে মরতে হবে বাংলার আশা ছেড়ে দাও। 

জেগেছে জেগেছে বাঙ্গালী নিস্তার বুঝি নাই আর,

অত্যাচারীর ধ্বংস হবেই নাই তবু কভূ নিস্তার। 

এতোদিন যা করেছ শোষণ তার খেসারৎ দিতে হবে,

নইলে তোমরা শুনে রাখ তোমাদের চিহ্ন না রবে ভবে। 

যে পাপ করেছ তোমরা হিংস্র বর্বর পশুর অধম,

লাখ শহীদের রক্তে আজি সত্য মন নিয়েছে জনম। 

আজ মোরা তাই বাঙ্গালী জাতি গাহি বিজয়ের গান,

ত্যাগ তিতিক্ষা বিনা কোন জাতি পায়নি স্বাধীনতার মান। 

০১/০৭/৭১ সাল। 

(৫)

“বাংলা মায়ের ডাক”

আজকে মোদের ডাক এসেছে বাংলা মায়ের থেকে,

মাতৃভূমি রক্ষা করো সবারে বলছে ডেকে ডেকে। 

পশ্চিমা ওই সব দস্যু সেনার খতম করতে হবে,

নইলে মোদের জাতিটাকে ধ্বংস যে করবে সবে। 

আর থেক’না ছেলেরা মোর থেক’না আর বসে,

বজ্র হাতে অস্ত্র ধরো সবাই নিশান ধর’ কষে। 

দেখবে তখন দস্যু সবে পালাবে সব তেড়ে,

কঠিন সাহস বক্ষে তোঁদের চলিস কেতন নেড়ে। 

সত্য ন্যায়ে বিশ্বে সেরা বাঙ্গালীরা এক জাতি,

হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃস্টান সবাই মানব জাতি। 

দেখিয়ে দেবে বিশ্বকে আজ তোমরা বীর্য ধারী,

দিকে দিকে সত্যের বান ডাকছে শোন ভেরী। 

বাংলাদেশের কাঁদা মাটি তোদের পানে চায়,

যুদ্ধ তোদের মুক্তির পথ তাই যুদ্ধ করবি আয়। 

০৯/০৮/৭১ সাল। 

(৬)

“রণাঙ্গনা বাংলাদেশ’

বিশ্ববাসী দেখবে এসো বাংলা মায়ের রুপ,

পশ্চিমা কুত্তার অত্যাচারে বান ডেকেছে

শহীদ ছেলের রক্ত স্রোতে নেশায় যেন-

ফাগুন ছোটে টগবগিয়ে ভরিয়ে দিতে বুক। 

স্বাধীনতা আনবে বলে লক্ষ কোটি দামাল ছেলে,

জীবন দিতে ছুটছে সবে ঝড়ের বেগে দলে দলে। 

আকাশে বাতাসে শত্রু হননের দুর্জয় নেশা-

দস্যু সেনা হচ্ছে খতম পায়না খুঁজে দিশা। 

অনির্বাণ ছোটে দিকে দিকে দুরন্ত গতিতে,

সংগ্রামে সব শত্রু সেনা ভেসে যায় সে স্রোতে। 

লাখ শহীদে জন্ম নিয়ে কোটি কোটি মুক্তি সেনা,

বজ্র কন্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে শোনায় মুক্তি বীণা। 

ছুটে চলে সবে জীবন নেশায় টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া,

স্বাধীনতা সূর্য দু’হাতে করে আনিবে তাই জীবন দিয়া। 

ও আমার বাংলা মাগো জননী রণাঙ্গনা বাংলাদেশ,

জীবন দিয়ে তোমার বুকে ঘুমাব আজি মনে খায়েশ। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(৭)

“জেগেছে বাঙ্গালী”

জেগেছে আবার নতুন করে মুক্তির তরে বাঙ্গালী,

জাতীয় মুক্তি এনেছি আমরা অরুণ রঙে রাঙালি। 

বজ্র সম আঘাত হেনে শত্রুকে সব করবে জখম,

মৃত্যুর ভয় করিনা’ক আর দানবেরে করব খতম। 

দিকে দিকে দাউ দাউ করি জ্বলছে শুধু অগ্নি,

বাঙ্গালী মুক্তির বিজয় কেতন উড়িয়ে দি’ছে ভগ্নি। 

আকাশে বাতাসে উঠিছে এবার ঝড়ের কাঁপন,

জয় জয় বাঙ্গালীর জয় ধ্বনি ছিড়িছে বাঁধন। 

দিকে দিকে তাই শত্রু সব ব্যস্ত ত্রস্ত পালাতে,

ধরে ধরে মারব সবাই ঝুলাব ওঁদের ফাঁসিতে। 

দেখব তখন কোথায় পালায় মানবরুপী শয়তান,

বাংলাকাশে উঠিছে সূর্য এ যেন মুক্তির আহবান। 

শত্রুরা ত্বরা প্রস্তুত হও পাপের শাস্তি নিতে,

মিথ্যে কথায় বার বার চেয়েছে ধোঁকা দিতে। 

পারবে না পারবে না সত্য যে জেগে রবে,

শুনে নাও পাপের শাস্তি তোদের নিতে হবে। 

মিথ্যে কখনো টিকিয়া থাকেনা এ পৃথিবীতে,

ইসলাম তার প্রমান দিচ্ছে পবিত্র কোরানেতে। 

জয় আমাদের সুনিশ্চিত বাঙ্গালীর হবে জয়,

মুক্তি যুদ্ধ এ জগতে কি কোন দিন বিফল হয়?

০৭/০৮/৭১ সাল। 

 (৮)

 “বঙ্গ জননী”

বঙ্গ জননী বাংলা মাগো-

জন্মেচ্ছি তোমার বুকে। 

পেটের ক্ষুধা মিটিয়েছ  সূধা,

ধন্য মোরা তাই সুখে। 

বিচিত্র রঙে রঙিন তুমি,

সোনার মতন মুখ। 

মা’তোর স্নেহ মমতা দিয়ে-

ভরিয়েছ মোদের বুক। 

রম্য শ্যাম্য শষ্য শ্যামলা,

আমার বঙ্গ ভূমি। 

মাগো, তাই মোরা আশির্বাদ পাই-

তোমার পদ চূমি। 

ভোর বেলায় পাখীর কূজন

পল্লী সুর ভাটিয়ালী। 

শরতের রোঁদ ডানা মেলে-

ঢেউ খেলে যায় সোনালী। 

০৪/০৩/৭১ সাল। 

(৯)

 “বাংলা মাগো”

ও আমার বাংলা মাগো

তোমায় কতো ভালোবাসি। 

তোমার কোলে হেসে খেলে

বাঁজাই সুরে বাশী। 

সকাল দুপুর কোকিল ডাকে

কুহু কুহু সুরে। 

কুলু কুলু ছন্দে নদী

বয়ে চলে দূরে। 

সুন্দর তুমি গগন চূমি

(মাগো) মিষ্টি তোমার হাঁসি। 

শত দুঃখ কষ্টে আমি-

তোমায় ভালোবাসি। 

দোয়েল কোয়েল শ্যামা ঘুঘু

তোমা’ পানে চায়। 

মানব দানব সবে মিলে

তোমারই গান গায়। 

রম্য সৌম্য শষ্য শ্যামল

মিষ্টি মুখের হাসি। 

স্নেহে তোমার জড়িয়ে দিলে

তাইতো ভালোবাসি। 

তোমারই ডাক পেলে মাগো-

ঘরে ফিরে আসি। 

ভূবন জুড়ে শ্রেষ্ঠ মাগো-

তোমার মিষ্টি হাসি। 

০৬/০৩/৭১ সাল। 

(১০)

 “বঙ্গ নারী”

একটি নারীর মুখ দেখেছি

জানিনা মানব কিংবা পরী। 

জোছনা রাতের রুপের ছটা

সেযে সর্গের অপসরী। 

দূর থেকে দেখেছি তাঁরে

শুধু এক নজরে। 

প্রতিজ্ঞা তাই মনে মনে

বধূ করে তুলব ঘরে। 

পঁচিশে মার্চ চোখে শুধু

জ্বলছিল অগ্নি শিখা। 

রক্ত দিয়ে বাঙ্গালীর বুকে

লিখেছিল রক্ত লেখা। 

বাংলার বুকে রক্তের স্রোত

বহিয়ে দিয়েছিল। 

পশ্চিমা কুত্তা সে আগুনে

ভস্ম হয়ে গেল। 

এরপরে আর দেখিনি তাঁরে

কোথায় সে চলে গেছে। 

বঙ্গ জননীর বুকে সে আজ

শান্তিতে শুয়ে আছে। 

০৫/০১/৭১ সাল। 

(১১)

 “রক্ত প্রাসাদ”

তোমরা গড় শ্বেত পাথরের প্রাসাদ

বাঙ্গালীর রক্ত শোষণ করে। 

ভরেছ পিন্ডি করাচী ইসলামাবাদ

দেখিয়া বিশ্ব কাঁদিয়া মরে!

তেইশ বছরে দাওনিক’ অধিকার

দিকে দিকে শুধু জ্বালিয়েছ আগুন!

প্রতিষ্ঠিত হয়নিক’ মোদের স্বাধিকার

শুধু বাংলাকাশে উড়িয়েছ শকুন। 

তোমাদের প্রাসাদ ভাঙব এবার

মানবনা কোন বাঁধার ধারা। 

আমাদের তাজা রক্তের স্রোতে

নিয়ে যাবে অগ্নি কারা। 

দেখ দেখ চেয়ে দেখ রক্ত প্রাসাদ মোদের

কোনদিন ওরা ক্ষমা পাবেনা। 

জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষে তোদের

ভবে এতোটুকু চিহ্ন রাখবেনা। 

তাই বলি ফের কুত্তা তোদের

প্রাণ নিয়ে ফিরে যা দেশে। 

লাখ শহীদের রক্তের প্রাসাদ মোদের

মৃত্যু তোদের মারবে পিষে। 

শোন ওরে শোন সিংহের হুঙ্কার

বিশ্ব সেরা আমরা বাঙ্গালী জাতি। 

প্রাসাদ তোদের ধূলিসাৎ করে

 মোরা,কুটির গড়ি নিশিত রাতি। 

 ২১/০৮/৭১ সাল। 

(১২)

“অমর ৮ই ফাল্গুনী”

চিৎকার শুনি চারিদিকে একি সব কান্না

ঢাকা থেকে গ্রামাঞ্চলে সবার মনে বেদনা। 

নয়নের জল মুছে ফেলে মোরা হই আগুয়ান,

ওরা নিষ্ঠুর মানব দানব হিংস্র পশু শয়তান। 

বঙ্গ মায়ের বীর সন্তান শত জন্ম নিয়ে এ বুকে,

জীবন দিয়ে রক্ত দিয়ে ঘুমিয়ে আছে যে সুখে। 

সালাম, জব্বার, রফিক, শফিক আর ভাই বরকত,

অম্লান হয়ে জেগে আছে ওরা বুকে নিয়ে যে ক্ষত। 

অমর ৮ই ফাল্গুনী শিহরী উঠি ভয়ঙ্কর একি দৃশ্য,

আকাশে বাতাসে দলিত মথিত শয়তানসব ভস্ম। 

ভাষা আমার ভাষা তোমার বাংলা মাতৃভাষা,

তোমাদের বুকের রক্তে সেদিন হয়েছিল জয়ীর আশা। 

রক্তের স্রোত বয়েছিল সেদিন ঢাকার বুকে,

মানবের সাথে ফিরিস্তারা কেঁদেছিল দুঃখে। 

সেদিন দানব বলেছিল উর্দুই হবে রাষ্ট্র ভাষা,

সংগ্রাম চলেছিল রক্ত ঝরিয়েছিল সর্বনাশা,

পিচঢালা পথ হয়েছিল লাল উঠেনি রবি ঊষা। 

চারিদিকে শুধু ত্রাসের ফনা চেয়েছিল কাল নেশা। 

ক’দিন আসবে তোমরা মোরা আজো কাল গুনি,

অমর সে শহীদের রক্তে এ যে আটই ফাল্গুনী। 

ওগো সালাম, জব্বার, রফিক, শফিক, ভাই বরকত,

চেয়ে দেখ চারিদিকে সব তোমাদের ভাই মহব্বত। 

মরণী তোমরা মরণী আজো জেগে আছো মম অন্তরে,

বিশ্ব ইতিহাস এঁকেছে সে ছবি বাঁধা কালো অক্ষরে। 

০২/০১/৭১ সাল। 

(১৩)

“রক্ত চাই! রক্ত চাই!”

দুর্জয় বেগে ছুটে চলেছে মুক্তি সেনানী দল,

বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে আজি হইয়াছে চঞ্চল। 

দিন দুনিয়ার নিয়ম ত্যাজি ছুটছে সব নতুন গানে,

পিপাসা সব মিটবে আজি শত্রুর তাজা রক্ত পানে। 

আকাশ বাতাস কাঁপছে আজি মায়ের মুক্তি সংগ্রামে,

বিশ্ব মাতার আঁচলখানি উড়ছে আজি ডানে বামে। 

দিকে দিকে ছুটছে সবাই দুর্বার দুর্জয়,

মোদের বাংলা ছাড়তে হবে ইতিহাস কয়। 

রক্ত দিতে শিখেছি মোরা থাকব না’ক বসে ঘরে,

দস্যু সব করব খতম কামানের পর কামান মেরে। 

মোদের দেখে বিশ্ববাসী কাঁপছে ভয়ে থর থর,

শাসনে শোষণে হৃদয় মোদের করেছে জর জর। 

ভুলি নাই ভুলি নাই কভূ জীবন থাকিতে এ দেহে,

গড়েছি দুর্গ মোরা আজি তাই প্রতিটি গৃহে গৃহে। 

এসেছে এসেছে সময় এবার রক্ত চাই রক্ত চাই,

দিগন্তে ঐ নব সূর্য রক্ত দেব শুধু স্বাধীনতা চাই। 

১৯/০৮/৭১ সাল। 

(১৪)

“জন্ম ভূমি”

জন্মভূমি মাগো! নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে

দিয়েছে জীবন; তোমার পবন। 

উজ্জ্বল নিষ্পাপ সুন্দর মুখ দেখেছি আমি

তোমার বুকে শিখেছি খেলাধুলা,

শিখেছি দুর্গম পথ চলা,

তোমারই কোমল স্নিগ্ধ কোলকে করেছি-

উজ্জ্বলময়।  শিশু কালের ধাপ পেরিয়ে

তোমার বুকে মাথা রেখে আপন মনে-

ঘুমিয়েছি।  তোমারই চোখের অশ্রু নীরে

হয়েছি পূণ্যবান।  তোমারই চরণে-

এ প্রাণ করেছি দান, তোমারই-

বৃক্ষের ফল করেছি ভক্ষণ, তোমারই

পুষ্প দিয়ে গেঁথেছি মালা।  সম বয়সী

সাথীদের সাথে করেছি আহলাদ। 

তোমারই বুকেতে আমি-

রেখেছি জীবন মেলা। 

হাত জোড় করি চাহিয়াছি ক্ষমা,

শিখিয়েছ লিখিয়েছ তোমারই ভাষা,

যৌবনের পথে এলাম আমি

শৈশব ত্যাগ করে। 

ঘুরাতে তোমারই বুকেতে মোরে-

তৃপ্তিতে তাই ভরলো এ মন;

আমার পূর্ব পূরুষ জন্ম নিয়েছে

তোমারই বুকে।  কচি পেরিয়ে আমারই মত,

তোমারই দেহের লাবন্য দিয়ে

গড়েছিলে সবাইকে। 

বাংলা মাগো! তুমি শুধু

একা আমার মা’ নও,

বিশ্বে সবার জননী মা,

তোমার শ্যামল বুকেতে আমার

পিতামহরা শান্তিতে শুয়ে আছে,

তাঁদের নিষ্পাপ মন আজি-

রয়েছে তোমার মাঝে। 

তোমার বুকের রক্ত দিয়ে তৈরি

আমার দেহ, সবকিছু রেখে

চলে যাব আমি গৃহ ফেলে-

তোমার মাঝে একাত্ম হয়ে। 

২৯/০৮/৭১ সাল। 

(১৫)

 “প্রতিজ্ঞা”

আমাদের কঠিন মুষ্টাঘাতে

ভাঙব মোরা কারার কপাট। 

বন্দীকে সব মুক্তি দিয়ে

করব মোরা নোতুন শপত। 

তোমার বুকে রুলার হেনে

এগিয়ে যাব সম্মুখ পানে। 

সব কিছু গুড়িয়ে দেব

বাঁধব এমন সুরের তানে। 

এতো দিন যা সহ্য করেছি

আর কভূ সহ্য করিবনা। 

দুর্জয় বেগে এগিয়ে যাব

কভূ বিপদের ভয়ে টলিব না। 

জীবন প্রভাতে এনেছি আজি

রঞ্জিত হলো রক্ত লাল। 

অন্যায়কে আজ গুড়িয়ে দেব

আমরা বাঙ্গালী কিশোর দল। 

১৯/০৮/৭১ সাল। 

(১৬)

 “একটি ফুটন্ত ফুল”

দেখেছি সেদিন বাংলা মায়ের বুকে

ফুটন্ত একটি ফুল। 

ফুলের সৌরভে বিশ্ব মাতোয়ারা

সোহাগে মশগুল। 

রক্তের দিনে রক্তিম কণা

রক্তে রঞ্জিত হলো। 

নিখিল বিশ্ব মায়ের বুকে

রক্তিম টিপ উজ্জ্বল। 

ছিড়তে সে ফুল ইয়া’ আয়ুব

বাড়িয়েছিল দু’হাত। 

অমনি তাই সত্য এসে

করেছিল সংঘাত। 

তবুও ওদের মেটেনি লালসা

রক্তের স্রোত বহিয়ে দিয়ে। 

মৃত্যু তাদের এসেছে দুয়ারে

তারা সেদিন পড়েছিল নুয়ে। 

বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সে ফুল

সোনার ছেলে শেখ মুজিব। 

লাখ শহীদের রক্তে ভিজে

তাইতে হলো সবাই সজীব। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(১৭)

 “মুক্তির আহবান”

বীর বাঙ্গালী আজ কান পেতে শোন

শত্রুর বিরুদ্ধে কঠিনতম বজ্র হানো। 

তেইশ বছর করেছে শোষণ আর-অবিচার

প্রতি পদে বাঙ্গালীরা পাইনিক’ অধিকার। 

তাই আজি মুক্তির তরে অস্ত্র নিয়ে

শত্রুকে হুঁশিয়ার করি দামামা বাজিয়ে। 

শোন শোন শোন আজি হে বিধাত্রীর

ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে বাঙ্গালী বিজয়ী বীর। 

কে আছো তোমরা কোথায় হও আজি আগুয়ান

দেখিয়ে দেব রণক্ষেত্রে মোরা দীপ্ত অনির্বান। 

অত্যাচারীর খড়্গ তাই ভাঙব মোরা আজি

মৃত্যু ভুলে তাইতো মোরা রণ রঙ্গিণী সাজি। 

মৃত্যুকে আর করিনা এতোটুকু মোরা ভয়

রক্তের বদলে রক্ত দিয়ে বিশ্ব করিব জয়। 

বাংলাকাশে উঠবে আজি নতুন সূর্য আলো

মিথ্যের আলো নিভিয়ে সত্যের আলো জ্বালো। 

১৮/0৮/৭১ সাল। 

(১৮)

 “মিছিল”

মিছিল সবে বেরিয়েছে আজি,

দিক্বিদিকে উঠিছে বাজি

শান্ত শিষ্ট নম্র পরিবেশ,

শহর থেকে গ্রামাঞ্চলেও নাই শেষ। 

দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘন্টা,

নেই তার বিরাম এ যেন ঝঞ্ঝা। 

দিকে দিকে ভেসে আসে শ্লোগান,

কঠিন কর্কশ নয় এ যেন মহিয়ান। 

নির্যাতিত মানুষের দাবীর ভাষা,

এতেই সবার মুক্তির আশা। 

এপথ ওপথ সেপথ শেষে

সবাই এতে যোগ দিয়েছে এসে। 

দাবী মোদের দাবী মানতে হবে,

নইলে শোনো মোদের সংগ্রাম চলবে। 

তাকিয়ে দেখ লাখ লাখ জনতা,

মৃদু হেটে কন্ঠে শ্লোগান, নেই বারতা। 

এমনি করে মিছিলেরই তরে-

দাবী আদায়ে চলবে জীবন ভরে। 

শুধু মিধিল আর মিছিল, তাকিয়ে দেখ মিছিল,

দিকে দিকে তার সুরে সুরে পথ হয়েছে পিচ্ছিল। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(১৯)

“সব্যসাচী”

দেখেছি সেদিন এক বটবৃক্ষের ছায়ে

জড়সড় হয়ে ভিজছিল একটি মানুষ,

পরের দুঃখে সে সম দুঃখী

কাঁদে সে নিরালায় বসি। 

গরীবের ব্যাথায় সম ব্যাথি,

তার নামটি কি জানো? না না জাননা,

আমি বলছি, নামটি তাঁর বন্ধু,

সে যে সেই সব্যসাচী,

চমকে উঠি! চলেছে কোথায়-

আনমনে, মাথায় কিসের বোঝা!

বুঝেছি নির্যাতিত নিপীড়িত লাঞ্ছিত

মানুষের সেবা করাই ওঁর কাজ। 

তারপর আর দেখিনি তাঁকে

কয়েক মাস ধরে-

কোথায় গেছে বলতে পারকি তোমরা?

না, কেও পারেনি জবাব দিতে,

কেমন করে দেবে বলো?

হঠাত একদিন জঙ্গল থেকে

বেরিয়ে এলো লোকটি,

দিকে দিকে বেজেছে যুদ্ধের দামামা,

হারিয়ে গেল সব্যসাচী,

চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত!

রাতের অন্ধকারে কে যেন-

হেটে চলেছে একমনে-

রাতের পিছল রাস্তা দিয়ে,

তাঁর অনির্বান দুটি চোখ,

রাতের অন্ধকারে শুভ্র

তারকার ন্যায় জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। 

সে চোখে যেন প্রতিশোধের নেশা-

হত্যার বদলে হত্যা! বিশ্বকে-

করবে বুঝি পুড়িয়ে ছারখার,

হায়েনার অপরাধের শাস্তি দিতে

তার অতৃপ্ত আত্মারে দিতে

এতোটুকু স্বস্তির নিঃশ্বাস!

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(২০)

 “নব বর্ষায়”

আজি এ বরষায় চারিদিকে গেছে ভরে

বাংলা থেকে শত্রুরা আজ পালাচ্ছে তেড়ে। 

দিকে দিকে শুধুই দেখি অথই পাথার,

মুক্তির সংগ্রাম মোদের নাই ওদের নিস্তার। 

বিদ্যুৎ সম হানবে আঘাত শত্রুর বুকে,

মায়ের বুক ভরিয়েছে রক্তে ওরা দিবালোকে। 

একটি সবুজ কলি চেষ্টা করে উপরে উঠবার,

একবার নয় দুবার নয় করে চেষ্টা বারবার। 

অবশেষে হার মানায় সেযে মেঘ জল বৃষ্টিকে,

বিদ্রোহে ঠিক এমনি করে ভাঙে সব কিছুকে। 

বাংলা মায়ের সকল ছেলে চায় যে মায়ের মুখ,

 জীবনে কখনো চায়নিক’ ওঁরা জমিদারী সুখ। 

টুকরো টুকরো করবে আজি শত্রুর রাজপ্রাসাদ,

শেষ তৃষ্ণা মিটিয়ে নাও তোর জীবনের আস্বাদ। 

আর নয় আর নয় শোন এই নব বরষায়,

ভেঙে তোদের গুড়িয়ে দেব হুঙ্কারে তাই। 

১৮/১৮/৭১ সাল। 

(২১)

  “দেখবে এসো”

ঢাকা খুলনা চট্টগ্রাম দেখবে,

দেখবে এসো বাংলাদেশ। 

শত্রু হননের অগ্নি নেশা,

দেখবে এসো রণ রঙ্গিণী বেশ। 

দিকে দিকে তার মুক্তি সেনা,

বজ্র হাতে অস্ত্র নিয়ে। 

দলে দলে এগিয়ে চলে,

রক্ত রাঙা কেতন উড়িয়ে। 

আকাশে বাতাসে উঠিছে ধ্বনি,

ধন্যি মাগো বাংলাদেশ। 

শত্রু হননের নেশা চোখে তোর,

চেয়ে দেখ রণ রঙ্গিণী বেশ। 

বাংলা মায়ের পাষাণী মেয়ে

সে বর্ষা রাণীর ডাক। 

তার বুকে ভেসে মুক্তিসেনা

হাকিছে হায়দরী হাক। 

শত্রুরা আজ ভয়েতে তাই

ছুটে পালায় ত্বরে। 

এবার বুঝি মুক্তি সেনা

ফেলল তাদের ধরে। 

মুক্তির হাতের আঘাত খেয়ে

মরছে শত্রু লাখে লাখে। 

লড়ায় কালে নিঠুর ওরা,

মরছে তাই পথের বাঁকে। 

স্রষ্টার নাম নিয়ে আজি

লড়ে মুক্তি সেনার দল। 

মুখে সত্য বুকে কুরআন

তাঁর বাহুতে নবীন বল। 

দেখিয়ে দে বাংলা মাগো

তোমা’ রণ মুর্তি বেশ। 

শত্রু হননের নেশা চোখে

এ রক্তের বাংলাদেশ। 

বিশ্ববাসী তোমার গুণে

আজি হয়যে গুণান্বিত। 

তোমার প্রেমে তোমার ধ্যানে

রয় যে অবিরত। 

শহর গ্রাম দেখবে নগর

দেখবে এসো বাংলাদেশ। 

রক্তের বন্যা বইছে সেথা

মা’র রণ রঙ্গিণী বেশ। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(২২)

“আহবান”

কয়াল বৈশাখী আঘাত হানো

তোমার বজ্র কঠিন শক্তি দিয়ে। 

ভেঙে সব গুড়িয়ে দাও

শত্রুর সব হাতিয়ার। 

অত্যাচারীর ধ্বংস করো

বিভীশিখার দীপ জ্বালো। 

নিরীহ বাঙ্গালীরে করছে হত্যা

নির্বিচারে পশু হায়েনার মতো। 

এসো হে বন্ধু কাল বৈশাখী

এক সাথে লড়ব বন্ধু প্রিয় যত। 

ভেঙে উপড়ে ফেলব বিষ দাঁত

ইস্পাত সম হাতুড়ি দিয়ে। 

তোমাকে বড় প্রয়োজন আজি

বাংলার রক্তে ভেজা মাটিতে। 

তোমার অপেক্ষায় বীর সেনারা

বিশ্বকে দেখিয়ে এবে নোতুন করে। 

প্রতিশোধ নিতে শত্রুর উপর

সিংহের মতো হুংকার ছেড়ে। 

এক এক করে ফেলব ভেঙ্গে

শত্রুর সব কালো হাত। 

তুমি এসো রক্ত রাঙা পায়ে

মিটাও পুরো সাধ। 

যাক মুছে কলঙ্ক কালিমা

ধুয়ে দিক রক্তের রেখা। 

রক্তের বদলে প্রতিশোধ রক্ত,

কষ্টের পরে সুখের দেখা। 

খুনের বদলে খুন প্রাণের বদলে প্রাণ,

তূর্যের বদলে রণ ভেরী ওই শোন,

ডাকিছে আমারে তোমারে,

কালের প্রবাহে এসোহে আবার

এসো বিদ্রোহী কবি নজরুল এসো,

এসো শুকান্ত প্রয়োজন শুধু

তোমাদের রক্তের বাংলাদেশে। 

বাংলা আজ রঞ্জিত রক্তস্নানে

যেন প্রস্ফুটিত গোলাপ একটি লাল সূর্য। 

 ২০/০৮/৭১ সাল। 

(২৩)

 “শুকান্ত নজরুল”

আমি হব’ শুকান্ত

আমি হব’ নজরুল। 

বিশ্ববাসী মম গানে

রহিবে যে মশগুল। 

চেয়ে দেখ নজরুল শুকান্ত

অন্তরীক্ষ হ’তে। 

তোমাদের লেখনীর প্রয়োজন

আজি রক্তের বাংলাতে। 

আজ আমি তাই লিখি সব

চিত্রপটের ঘটনা গুলি। 

নিঃসংকোচে আর অবিশ্রান্ত মনে

চালিয়ে যাব লেখনী তুলি। 

পারলে মোরে কর’ ক্ষমা

না পারার কর্ম তরে। 

প্রজ্বলিত কঠিন বারুদ ন্যায়

ভাসব শুধু অশ্রুনীরে। 

আমি হব’ নজরুল

আমি হব’ সুকান্ত। 

বিশ্বকে জানিয়ে দেব’

আমি শুধু অশান্ত। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(২৪)

 “অমৃতের পুত্র বাঙ্গালী”

অমৃতের পুত্র ওঁরা বাঙ্গালী জাতি

অমৃতের সুর ঢালিয়াছি তান। 

স্বাধীনতার তরে আজি মোরা তাই

এ জীবন প্রাণ করিয়াছি দান। 

শোষণে শোষণে জীবন মোদের

হইয়াছে আজি নর কঙ্কাল। 

শাসন শোষণের অবসান করে

জ্বালব আজি নব মশাল। 

ভাঙব মোরা কারাগার যত

মুক্তি দেব সব কয়েদীর। 

দেখব এবার পালায় কোথায়

বাংলা থেকে অশুভ শক্তির। 

তেপান্তরের পার হতে আজ

ডাক এসেছে নতুন করে। 

ইট পাথরের প্রাসাদ ভেঙে

মাটির প্রাসাদ তুলব গড়ে। 

তেইশ বছর শাসনের নামে

করেছ শোষণ শুধু নির্যাতন। 

লাখ মা’বোনের নিয়েছ ইজ্জত

দাওনি তাঁদের গাত্রে বসন। 

দিকে দিকে শুধু শান্তির নামে

দিয়েছ বয়ে রক্ত বন্যা। 

রক্ত সাগর পান করি মাগো

হয়েছ আজ তুমি ধন্যা। 

ধিক! তোমাদের রক্ত ক্ষুধা

কেমন করে মিটবে বলো?

মোরা বাঙ্গালী অমৃতের পুত্র

কষ্টাবসানের মশাল জ্বালো। 

দিবস শেষে আসলো নেমে

বিশাদের সে আবরণ। 

এবার মোদের আক এসেছে

বাজিছে দামামা ডাকিছে রণ। 

রণাঙ্গনে শত্রুকে করব খতম

শোষণকারী যত শয়তান। 

বঙ্গমায়ের মুখ থেকে আজ

পেয়েছি মোরা সে আহবান। 

হাওয়া এবার ফিরেছে ভাই

খুঁজে পেয়েছি নতুন প্রাণ। 

দেশের জন্য হাসি মুখে আজ

জীবন যৌবন করিব দান। 

ভেসে আসা অজানা কোন

মহামানবের কন্ঠ শুনে। 

এগিয়ে যাব শমশের হাতে

চির সুখ-শান্তির পানে। 

এমনি করে এমনি ভাবে

সামনের একদিন। 

মোরা হবো অমৃতের পুত্র

রক্তে রঞ্জিত রঙিন। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

“বাংলা ছাড়”

মুক্তির পথে অরুণ রবির

আলোর পরশে বীর। 

এসো বাঙ্গালী ছুটে যাই রণে

কভু নোয়াইবনা শির। 

পরিত্যাগ করো বাংলার মাটি

সাবধান! হানাদার!

প্রতিশোধ নেব অস্ত্র মুখে

ছাড়ব নাকো আর। 

তোমাদের শিরে শোভে পাদুকা

বঙ্গ কিরীট নয়। 

ভিক্ষার ঝুলি শোভে গলেতে

শোভেনা কুবলয়। 

মিথ্যার বসন গাত্রেতে তোদের

সত্যের অভিনয়। 

বাংলা ছাড় নচেৎ মৃত্যু তোদের

আরতো সময় নাই। 

২৫/০৮/৭১ সাল। 

(২৭)

 “মুক্তির সূর্য”

শান্তি লভেছি আমরা মাগো

মুক্তি আনিব জানি। 

কুয়াশা নিশিতে চন্দ্র কিরণে

আঁধার ফেলেছি টানি। 

আমরা মরে যা আছি বেঁচে

পথ চলো পথ চলো। 

অস্ত্র লহ করেতে আজি

রক্ত মশাল জ্বালো। 

মরণ পথের যাত্রী মোরা

মৃত্যুকে আজ দেখিয়ে দেব। 

মুক্তির বাণী ছড়িয়ে দিয়ে

শত্রুর অস্ত্র কেড়ে নেব। 

আঁধার মদের কেটে গিয়ে

উঠেছে ঐ অরুণ রবি। 

বংগ গীতি লিখলাম আজি

বংগ মাতার তরুণ কবি। 

৩০/০৮/৭১ সাল। 

(২৮)

 “পণ”

বিশ্বকে আজ দেখিয়ে দেব

আমরা কত বড় বীর। 

আয়ুব ইয়ার অত্যাচারে

কভূ নোয়াইনিকো শির। 

তোদের হাতের অস্ত্র কেড়ে

হানব তোদের বুকে। 

সেই আঘাতে মরবি তোরা

মরবি ধুকে ধুকে। 

আমার ভাইকে করেছ হত্যা

আমার টাকার গুলি দিয়ে। 

আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছ

সেই অস্ত্র হাতে পেয়ে। 

বাংলাতে বাস করি মোরা

আমরা বাঙ্গালী সন্তান। 

বিষ দাঁত তোদের ভেঙে দেব

প্রস্তুত হও শয়তান। 

বাংলা মাগো আশির্বাদ দাও

তোমার কাঙাল ছেলেকে। 

বাংলাকে আজ করব মুক্ত

সত্য ন্যায়ের আলোকে। 

দেখুক সবাই জাগুক বিশ্ব

মোরা বাঙ্গালীর সন্তান। 

মায়ের মান নাহি দিব

জীবন করিব দান। 

এ ভবে মোরা থাকব নাকো

থাকবে মোদের স্মৃতি। 

যুগযুগ ধরে বিশ্বমাতা

গাইবে মোদের গীতি। 

চল ভাই ঝাঁপিয়ে পড়ি

মুক্তির সংগ্রামে। 

শত্রুকে আজি খতম করে

পাঠাব সব যমে। 

২৭/০৮/৭১ সাল। 

(২৯)

 ‘বঙ্গ ভূমি”

কি দেব উপহার আমি

সোনার বঙ্গ ভূমি। 

তোমার মুক্তির যজ্ঞে মোরা

দেব রক্তের অঞ্জলী। 

তেইশ বছরের ইতিহাস তোমার

রক্তের স্বাক্ষর। 

স্বাধীনতার মহান বীর চূড়ামণি

শেখ মুজিবর। 

গাত্রে তোমার খাঁদি বসন

কন্ঠে মধুর বাণী। 

মুক্তির বাণী শোনালে তুমি

তুমি মহৎ জ্ঞাণী। 

বাংলা আজি ধন্য তোমার

সেই মধুর বাণীতে। 

জেল খানাতে কষ্ট দেখে

বঙ্গ ছিল কাঁদিতে। 

 ০১/০৯/৭১ সাল। 

(৩০)

 “টিক্কা ইয়া বিচারের জন্য প্রস্তুত হও”

বিচার! বিচার! বিচার! বিচার!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কে করবে বিচার?

সে অধিকার নেই তোমাদের শামরিক জান্তা,

সাতকোটি বাঙ্গালীর নয়নের মণি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর;

তোমরা তাঁর করবে বিচার?

প্রহসনে তোমরা মেতেছ মরতে বসেছ,

তোমাদের অপরাধ ঢাকতে করছ ফন্দি ফিকির

বিচারের নামে তুলেছ জিকীর

শেষমেশ তোমরা দাঁড়াবে আসামীর কাঠগড়ায়। 

বাংলা যে আজ মুক্ত স্বাধীন

দিকে দিকে শোন তারই জয়ধ্বনি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর মধ্যমণি

সেই তোমাদের করবে বিচার। 

নিরপরাধ বাঙ্গালীকে করেছ হত্যা

অপরাধের সেই শাস্তি পেতেই হবে

জনতার বিচারে তোমাদের ফাঁসির রায় হবে

প্রমাদ গোনো সেদিন আর বেশি দূরে নয়। 

০৭/০৮/৭১ সাল। 

(৩১)

 “মহা মানবের কন্ঠ”

ঐ শোন কে ডাকে নাম ধরে

যুগান্তরের পার হতে। 

অত্যাচারের আজি কবর দিয়ে

আলোর পরশ পৌঁছাতে। 

মহামানবের কণ্ঠধ্বনি

বারে বারে আঁকে স্মৃতি। 

বাংলায় প্রতিশোধের নেশা

বয়ে চলে রক্ত নিতি। 

বাংলা মাগো বলছে আজি

অমৃতের পুত্র তোঁরা মৃত নও। 

আজি বিশ্বের ঘরে ঘরে

সত্যের আলো ছড়িয়ে দাও। 

যতই বাঁধা আসুক না কেন

কভূ শত্রুকে ভয় করোনা। 

সব কিছুই আজ চুর্ণ করো

পিছন ফিরে চেওনা। 

দেখবে সবায় মর্তে আজি

আসবে মর্তে স্বর্গ। 

সত্যের আলো জ্বলবে শুধু

লভিবে কস্তুরি মৃগ। 

বিশ্ব আজি তোদের কাছে

অশেষ কামনা করে। 

ভালবাসার বান ডাকিয়ে

বুকেতে দাও ভরে। 

অমৃতের পুত্র বাঙ্গালী তোমরা

মৃত্যুই আজ বরণীয়। 

বিশ্বের বুকে তোমরা তাই

হয়ে থাকবে স্মরণীয়। 

দোয়া করি তোমাদেরে

ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলো। 

সকল বাঁধা পায়ে ঠেলে

দেখতে পাবে সত্যের আলো

২৪/০৮/৭১ সাল। 

 (৩২)

 “আর্তনাদ”

আমি শুনেছি আমার বাংলা মায়ের আর্তনাদ

শুনেছি আর্ত পীড়িতের কান্না,

কি এক অব্যক্ত ভাষায় কাতর কন্ঠে-

বুঝাতে চাইছে বিশ্ব মানবেরে। 

টিক্কা ইয়াহিয়ার হত্যাযজ্ঞ থেকে

বাঁচতে চাইছে বাংলার আকাশ বাতাস,

আনাচ কানাচ অমানিশার করাল গ্রাস থেকে। 

মৃত আত্মারা ঘুরে বেড়ায়,

ওরা শহীদের মৃত আত্মা;

প্রতিটি রক্ত ফণা যেন এক একটি বিষধর সাপ,

ছোবল মারতে ছুটে আসছেযেন দলে দলে। 

লাখ শহীদের রক্তে বাংলার আকাশ

রক্তে রঞ্জিত প্লাবিত; রক্ত লালে জন্ম নিয়েছে

স্বাধীনতা সূর্য অবিনশ্বর,

অত্যাচারী জালিমদের করবে বুঝি ছারখার!

শোষিতের চিৎকারে প্রকম্পিত আজ

বাংলার আকাশ বাতাস প্রকৃতি

প্রতিশোধ নিতে এসেছে রণ সাঁজে,

খানখান করে ভেঙে শত্রুর কালো হাত। 

২৪/০৮/৭১ সাল। 

(৩৩)

 “২৫ মার্চের অস্থির প্রতিক্ষা”

১৯৭১’র পঁচিশে মার্চ,

সন্ধ্যার আবরণ পড়েছে ঢাকার বুকে,

সে আবরণে গ্রাস করতে চাচ্ছে পৃথিবী,

বাংলার সাতকোটি মানুষ আজ

প্রতিক্ষায় অপেক্ষায়;

আশায় রয়েছে জাতি ক্ষমতা গ্রহণ করবে। 

রাত গভীর হয়-

সবাই তন্দ্রাভূত ঘুমে। 

নীরব নিস্তব্ধ ঢাকা নগরী,

চলছে শুধু পাকিস্তানী হায়েনাদের সাঁজোয়া

গাড়ী আর বুটের শব্দ আসছে ভেসে,

ভুট্টো টিক্কা ইয়া সামরিক জান্তার বৈঠক। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দাবীতে অনঢ়,

অধিকার ছাড়তে নারাজ এক চুলও পরিমান। 

রাত গভীর, বারোটা ছুঁই ছুঁই

ঘুমন্ত নগরবাসী ঢাকা খুলনা চট্টগ্রাম-

রাজশাহী তাবৎ দেশ,

ব্যার্থ বৈঠক অকার্যকর লোক দেখানো-

সাজানো নাটক, আলোচনা এযেন

গোপনীয় এক দুরভিসন্ধি। 

বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতে ফিরলেন বাসায়। 

কিয়ৎক্ষণ পরে সামরিক জান্তারা করল বন্দি,

অতঃপর হাওয়াই করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। 

তারপর-

ঢাকা মহানগরীর ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষের

উপর নিঃশব্দে চালালো গুলি,

রোকেয়া হল রাজারবাগ পিলখানা বিডিআর হেড-

কোয়ার্টার সহ সকল প্রতিরক্ষা দপ্তরে। 

নিরস্ত্র নিরপরাধ বাঙ্গালীকে করল হত্যা,

জীবন দিল লাখ লাখ মানুষে;

নিস্তব্ধ রাত্রির নিরবতা ভেঙ্গে হলো-

প্রকম্পিত আওয়াজ-বাঁচাও বাচাও!

ট্যাংক কামান আর মেশিনগানের গুলির আওয়াজ,

ঢাকাকে করে ধ্বংস স্তুপের মৃত্যুপুরী!

নারী পূরুষ ছাত্র জনতা শিশু-

প্রোঢ় যুবা পালাতে থাকে প্রাণ নিয়ে যে যেদিকে পারে!

এ এক বীভৎস নারকীয় দৃশ্য যেন

হালাকু খানের ধ্বংসযজ্ঞ বাগদাদ নগরীয় ন্যায়

যেন তারই পুনরাবৃত্তি!

একি দৃশ্য! পৃথিবীর আর এক ইতিহাসে-

কালির পাতায় নজির বিহীন রক্ত ঝরা,

সমগ্র দেশ ফেটেপড়ে পরদিন,

আওয়াজ ওঠে রক্ত চাই! রক্ত চাই!

প্রতিশোধ নাও রক্তের প্রতিশোধ!

০৪/০৪/৭১ সাল। 

(৩৪)

 “নব সূর্য”

বাংলা মাগো তোমার বুকে

একি নিষ্ঠুর আজ নরহত্যা!

দিকে দিকে প্রলয়শিখা-

বইছে তান্ডবলীলা উঠেছে ঝড়,

চারিদিকে শুধু করে হাহাকার!

বাংলার ছেলের বুকের রক্তে-

রঞ্জিত হয়ে উহেছে, তোমার বুকের

উষর দিয়ে বয়ে চলেছে রক্তের স্রোত,

সে কি দৃশ্য! বীভৎস চিত্র!

বাংলার আকাশ বাতাস দলিত মথিত

রক্ত রঞ্জিত লাল সবুজের পতাকা। 

হাহাকার ধ্বনি কান্না হয়ে বাজে

সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর বুকে। 

তাইতো জাগে পূব দিগন্তে-

বিজয়ের পদধ্বনি মহামানবের কন্ঠে,

উতক্ষিত হয় শেখ মুজিবের অভয়বাণী। 

উদিত হবে বুঝি স্বাধীনতার লাল সূর্য,

সে আলোয় খুঁজে পেল জাতি মুক্তির পথ,

চির শাশ্বত কল্যাণ-স্বাধীন জীবনে আস্বাদ!

০৫/০৮/৭১ সাল। 

(৩৫)

 “রক্ত পিপাসা” 

বাংলায় আজি উঠেছে ঝড়

কারো নাহি বুঝি আজি নিস্তার,

ভাঙিয়া করিবে সবকিছুই

আজি তাই একাকার!

আকাশে বাতাসে উঠেছে রব

শুধু রক্ত রক্ত চাই!

শত্রুর তাজা রক্ত পানে

পিপাসা মিটাব আজি তাই। 

তপ্ত রিদয় করিব সিক্ত

কে আছো তোমরা কোথায়?

শত্রুর বুকের রক্ত চাই,

পার’কি দিতে তাজা রক্ত ভাই?

বাংলার নির্যাতিত মানুষের রক্তে

ভরেছে ওরা বাংলার বুক। 

তবুও মেটেনি তোমার সেই

বুভুক্ষা হৃদয়ের পিপাসা সুখ?

আর কত রক্ত বলো চাও

অনেক রক্ত দেব তোমায়। 

যত খুশি তুমি করবে পান-

নিরন্তর পাবে এই বাংলায়। 

২৯/০৮/৭১ সাল। 

(৩৬)

 “নির্ভীক চিত্ত”

‘আমি মৃত্যুকে ভয় করিনা,

জীবনের সুখ স্বাদ বুঝিনা। 

খোদা আমাকে পাঠিয়েছে আজি,

অর্থ বিত্ত সবই আমি ত্যাজি। 

মানুষ হয়েছি মানুষের সেবাই কাজ

সেবার কাজে নাহি এতোটুকু লাজ। 

রক্ত রাঙা এনেছি আমি সত্যের বন্যে,

সাতকোটি বাঙ্গালীর মুক্তির জন্যে। 

একদিন নয় সারাটি জীবন কেটেছে জেলে

চারি দিক মিথ্যায় পূর্ণ দেখেছি নয়ন মেলে। 

রক্ত দিয়েছি মোরা আরো অনেক রক্ত দেবো,

শত্রুকে সব খতম করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেবো। 

এক স্রষ্টারে ছাড়া করিনা’ক আমিকারও ভয়,

টিক্কা ইয়া জেনে নাও তোমাদের করিব ক্ষয়। 

উঠেছে তুফান লেগেছে কাপন ভেঙেছে কত নীড়,

শত্রুকে দেখে মৃত্যুর ভয়ে কভূ নোয়াইবনা শির। 

সিংহের বাচ্চা সিংহ আমি বীরের পুত্র বীর,

ভাঙব আজি চুরমার করি রহিব নাকো থির। 

২০/০৮/৭১ সাল। 

(৩৭)

“অবিসংবাদিত নেতা”

মুজিব মুজিব শেখ মুজিব,

দূর থেকে ভেসে আসে শেখ মুজিব!

নির্যাতিত শোষিত মানুষের

মুক্তির প্রতীক শেখ মুজিব!

আকাশ কাঁদে বাতাস কাঁদে

বিশ্ব মানব হুংকার তোলে,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব,

দরদী বন্ধু গরীবের বন্ধু-

শেখ মুজিব!

কুলি মজুর কামার কুমোর

চাষী তাতীর দরদী বন্ধু-

শেখ মুজিব!

তুমি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাক’

দীর্ঘ জীবি হও, তোমার কন্ঠে

দুলুক কোটি কোটি কুবলয়,

তোমায় শতকোটি ছালাম জানাই। 

আকাশের তারকারাজি কামনা করে

দীর্ঘ জীবন তোমার আপন মনে,

বাঙ্গালীর প্রিয় অবিসংবাদিত নেতা

শেখ মুজিব জিন্দাবাদ,

জিন্দাবাদ বাঙ্গালী জাতির জনক,

জিন্দাবাদ জানাই তোমায় লাখ ছালাম। 

২২/০৮/৭১ সাল। 

(৩৮)

 “অমর রওশনারা”

ধন্যা তুমি ময়ী তুমি

বীরাঙ্গনা রওশনারা। 

জীবন দিয়ে বাঙ্গালীর বুকে

ফুটালে আলোর ফোয়ারা। 

মরণী মরণী বোন

তুমি আজও মরণী। 

তোমার বুকের রক্তে

রঞ্জিত বাংলা ধরণী। 

কোটি কোটি বছর

এই বাংলার বুকে,

জপিবে নাম রওশনারা-

বাঙ্গালীর মুখে মুখে। 

শত্রুকে করেছ খতম

নিজের জীবন দিয়ে। 

বাঙ্গালী প্রাণ ফিরে পেল,

দুর্জয় শপৎ নিয়ে। 

বাংলা মা’কে রক্ষা করতে

নিজের জীবন দিলে। 

হাসি মুখে প্রাণ করিলে দান,

বুকের রক্ত ঢেলে। 

শোন শোন পরপার হতে

শোন প্রাণের বোন। 

তোমার রক্তের প্রতিশোধে

চতূর্দিকে বাজিছে রণ। 

বঙ্গ মাতার মুখখানি

করেছ তুমি উজ্জ্বল। 

বিশ্ব আজি তোমার তরে

হয়েছে উতলা চঞ্চল। 

কে বলে আজ মরেছ’ তুমি

সবার কাছে অতি প্রিয়। 

বাংলা মায়ের যোগ্যা কন্যা

হয়ে আছ তুমি স্মরণীয়। 

বাংলা মায়ের সোনার মাটি

হয়েছে আজি ইস্পাত। 

চারিদিকে তব শত্রুকে

করিতেছে ধূলিস্মাৎ। 

বোন রওশনারা চেয়ে দেখ

পরপার থেকে। 

তোমার মত রক্ত দিয়ে

রাখব তোমা’ স্মৃতিকে। 

তোমার বুকের রক্তে মোরা

দেশকে করব স্বাধীন। 

বিশ্ব আজ দেখবে মোদের

নইকো মোরা পরাধীন। 

তুমি সত্য তুমি মহান

তুমি হলে বরণীয়। 

তুমি বাঙ্গালীর ইতিহাসে

তাই হলে স্মরণীয়। 

২০/০৮/৭১ সাল। 

  (৩৯)

 “ঘুম থেকে”   

ঘুম থেকে চেয়ে দেখি

তুমিত’ রয়েছ জেগে। 

আমার শিয়রে তুমি-জন্ম ভূমি

সোনার বাংলাদেশ। 

সবুজে শ্যামলে ঢাকা

মাঠ ঘাট প্রান্তর। 

দোয়েল কোয়েল ডাকা

বাংলা মায়ের ঘর। 

হাজার পাখির একটি গান

একটি সোনার দেশ। 

সত্য মোদের সাথী

চলতে মানা নাই। 

কান্না হাসির মাঝে

পান্না খুঁজে পাই। 

লক্ষ কোটি প্রাণের স্বপ্ন

একটি সোনার দেশ। 

২৮/০৮/৭১ সাল। 

(৪০)

“স্বাধীনতা”

স্বাধীনতা তুমি মুক্ত প্রাণের জোয়ার,

স্বাধীনতা তুমি তন্বীর ভালবাসা,

সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর প্রাণে-

বেঁচে থাকার আশা। 

স্বাধীনতা তুমি আকাশের লাল সূর্য,

স্বাধীনতা তুমি রণ দামামা তূর্য,

স্বাধীনতা তুমি মায়ের বুকের-

সতস্ফুর্ত ভাষা। 

স্বাধীনতা কবি নজরুলের ছায়ানট হিন্দোল,

স্বাধীনতা তুমি পদ্মা মেঘনা যমুনার কলকল,

স্বাধীনতা তুমি শাশ্বত প্রাণে-

মৃত্যুঞ্জয়ীর আশা। 

১৫/১০/৭১ সাল। 

(৪১)

 “মুক্তির সংগ্রাম”

টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে-

আকাশে আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ,

বইছে শোঁ শোঁ শব্দ করে বাতাস,

নেশা ভরা দু’চোখে জ্বলছে হত্যার শিখা। 

বাংলার মাটিতে বইছে রক্তের স্রোত-

বাঙ্গালী জাতি আজ বদ্ধপরিকর

পশ্চিমা সেনা হত্যায়, যেন একজনও

জান নিয়ে না যায় ফিরে। 

হানাদার বাহিনী বেঁচে থাকা পর্যন্ত

চলবে মুক্তির সংগ্রাম চলে

জয়বাংলা গানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত

স্বরে ছুটে যাচ্ছে মহাশূন্যের

 এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। 

বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতা যুদ্ধের এক মহাদূর্গ

শত্রু হননের যেন মহা ফাঁদ

শত্রুরা জীবন বাঁচাতে মরিয়া

কাচকি মাছের মতো ওরা দিশেহারা। 

বঙ্গবন্ধুর মন্ত্র মুখে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে

বাংলার দামাল সোনারা

মুক্তির সংগ্রামে বদ্ধ পাগল

বুকের রক্তঢেলে হয়েছে আজ উন্মাদ!

০৮/০৮/৭১ সাল

(৪২)

“বাংলা মায়ের আর্তনাদ” 

রক্ত রক্ত রক্ত চাই

বাংলার আকাশে বাতাসে

হাহাকার ধ্বনি ওঠে

রক্তের বদলে রক্ত চাই। 

যে মাটির বুকে ছিল হাসির মাদল

ছেলে মেয়েরা কাটত ছড়া

যে মাটির শীতল ছায়ায়

পথভ্রান্ত অবিরাম পথচলায়

তৃপ্তি লাভ করত। 

সে মাটির সবকিছু আজ

উন্মাদ প্রতিশোধ পাগল বিদ্রোহী,

প্রতিটি শহীদ আত্মার করুণ বিলাপ

শোনা যায় গভীর রাতের অন্ধকারে। 

কে আছো কোথায় তোমরা সবাই

হত্যার প্রতিশোধ নাও

শত্রুকে বাংলার মাটি থেকে

 নিশ্চিহ্ন করে দাও,

একজন দস্যু সেনাও বাংলার

মাটিতে যেন না থাকে। 

আবার রাতের অন্ধকারে ভেসে আসে

তোমরা অমৃতের পুত্র তোমরা অমর,

তোমাদের বাংলাকাশে ঊষার দুয়ারে

নব সূর্য বিদ্যমান,

তোমরা বাঙ্গালীর ভবিষ্যত। 

০৯/০৮/৭১ সাল। 

(৪৩)

 “স্মরণীয় সকাল”

৭১’র মার্চের স্মরণীয় সকাল

নিস্তব্ধ আকাশের বুকচিরে

উদিত হয়েছে রক্তিম লাল সূর্য;

দু’এক মিনিটের জন্য

হারিয়ে ফেলছে নিজেকে। 

বাংলার আকাশে ভেসে চলেছে

পুঞ্জ পুঞ্জ কালো মেঘের ঝাঁক

পূব থেকে পশ্চিমে-

মুক্তির স্বাধিকারের আশায়। 

দিকে দিকে শুনি সামরিক জান্তার

গাড়ীর ভুস ভুস শব্দ;

চারিদিকে ত্রাসের কালো অমানিশা

সেই সাথে লক্ষ লক্ষ নর-নারীর

জীবন বাঁচাতে শব্দ!

সবাই ছুটছে কাল নাগিনীর

ফণা থেকে রেহাই পেতে

অজানা উদ্দেশ্যে অনিশ্চিত

ভবিষ্যতের সীমানায়

ভেসে আসছে কামান, মর্টার,

গ্রেনেড আর মেশিন গানের

নারকীয় বিভীশিখাময় ভয়ঙ্কর শব্দ!

বাংলার মাটিতে বইছে এখন

তাজা রক্তের লাল স্রোত,

বাংলা মায়ের বুক সিক্ত আজি

রক্তস্রোতে, তারই চিহ্ন-

প্রতিটি সকালের মোহনায়

উঁকি দিয়ে যায়-

রক্তাক্ত লাল সূর্য রেখা। 

 ২০/০৮/৭১ সাল। 

(৪৪)

“ বিশ্ববাসী দেখবে”

বিশ্ববাসী দেখবে এসো

আমার মায়ের বুকে। 

রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে

ঘুমিয়ে আছে সুখে। 

দিক দিগন্তে উঠল ফুটে

রক্ত জবা জ্যোতি। 

ছিনিয়ে তাই নিয়ে এলো

হাসির মুক্তা মতি। 

আকাশে বাতাসে সে সুর ধ্বনি

চিতকারিয়া ওঠে। 

অগনিত ফুল ঝরিয়ে দিল

টিক্কা ইয়াহিয়ার বুটে। 

লক্ষ কোটি ফুলের মাঝে

মাত্র একট ফুল। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর

দুলছে দোদুল দুল। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(৪৫)

“রক্তের ইতিহাস”

রাত্রি দশটা,

চতূর্দিকে অমানিশার আঁধারে ছেয়ে গেছে,

সে আঁধার থেকে মুচকি হাসি হেসে

ইতিহাস পাক হানাদারদের প্রতি

বিদ্রুপ করছে; দূরের কোন বৃক্ষের শাখায়

নিশাচর পাখী মাথা কুটে মরছে

আপন মনে, কিছুক্ষণ আগে মিশে গেছে

নিষ্পাপ জনতার করুণ আর্তনাদ

বিভীশিখার অন্তরালে!

শহর ঘুমন্ত জাগ্রত তন্দ্রায় খাচ্ছে হাবুডুবু,

বাঙ্গালী জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তির সংগ্রামে,

স্বাধীনতার জন্য রক্তে রঞ্জিত হয়েছে

বাংলার পবিত্র মাটি; বঙ্গ জননী রাতের আঁধারে

প্রহরীর ন্যায় দিচ্ছে পাহারা নিষ্পাপ সন্তানেরে,

ভয় কখন হানাদার কেড়ে নেবে বুক থেকে!

ভীত সন্ত্রস্ত বঙ্গ জননী বিনিদ্র রজনী জাগে,

ইতিহাস লেখে কালো কালি ছেড়ে রক্ত দিয়ে,

বাঙ্গালী নতুন ইতিহাস স্রষ্টা

বিধাতার সৃষ্টির পাশা পাশি গড়েছে আরেক ইতিহাস। 

স্তম্ভিত কম্পিত, তবুও ভীত নয়-নয় কোন

দ্বিধা সঙ্কোচের এ্যালবামের পৃষ্ঠে। 

নতুন আসন ছিনিয়ে নেবে বাঙ্গালী

বিশ্ব বিধাত্রী তাই কম্পিত বুঝি-

তার কর্তৃত্ব বুঝি এইখানে শেষ!

১৯/০৮/৭১ সাল। 

(৪৬)

“মুক্তির আহবান”

বিশ্বের বাঙ্গালীরা আজ কান পেতে শোন,

শত্রুর বিরুদ্ধে বজ্র কঠিন সম আঘাত হানো। 

তেইশ বছর করেছে শোষণ আর অবিচার,

প্রতিবাদ করে বাঙ্গালী জাতি পায়নি অধিকার। 

আজি তাই মুক্তির লাগি অস্ত্র হাতে নিয়ে

শত্রুকে হুশিয়ার করে রণ দামামা বাজিয়ে। 

শুনে নাও শুনে নাও ওগো বিশ্ব বিধাত্রীর

ছিনিয়ে আনব  দুহাতে আমরা বিজয়ী বীর। 

কে আছো কোথায় তোমরা হও আগুয়ান,

দেখিয়ে দেব রণক্ষেত্রে মোরা দীপ্ত অনির্বান। 

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভাঙব মোরা আজি,

তাইত মোরা মৃত্যুকে ঠেলে রণ বেশ সাজি। 

মৃত্যুকে আর করিনাক’ মোরা কভূ ভয়,

রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে বিশ্ব করিব জয়। 

বাংলাকাশে উঠেছে আজি নতুন আলো,

অশুর আলো নিভিয়ে সত্যের আলো জ্বালো। 

পুরাতন ভেঙ্গে করিব আজি তব ছারখার,

অশুভ শক্তি উপড়ে ফেলে করিয়া একাকার। 

কে রোধ করিবে আজি এ জাতির গতি উদ্যম,

কলুষিত হৃদয় আসিলে তবে করিব খতম। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

( ৪৭)

 “ ইতিহাসের কলঙ্ক ইয়াহিয়া”

শুনলে হাসি পাই! কান্না পাই,

ইতিহাসের কলঙ্ক ইয়াহিয়া,

ইতিহাসকে করেছে কলঙ্কিত-

চরম অপমান, দিকে দিকে তাই

ভেসে চলে তাই সত্যের বান,

দু’কুল ভাসিয়ে দুর্বার গতিতে। 

ইয়াহিয়া খুনি, ইয়াহিয়া খুনি,

ত্রিশ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যা করেছ,

আর বাংলার নিরীহ মানুষকে-

লক্ষ লক্ষ মা’বোনকে করেছ নির্যাতন। 

এক কোটি বাঙ্গালীকে করেছ গৃহহারা

রাতের অন্ধকারে চোরের মত

চালিয়েছ নির্দয় পাষাণের ন্যায় গুলি,

নিস্তব্ধ রাতের আঁধারের বুক চিরে

ভেসে আসে নিরপরাধ মানুষের

করুণ রিদয় মর্মভেদী চিৎকার কান্না!

অসহায় মা’বোনের উপর চালিয়েছ

পাশবিক অত্যাচার, মানবতার প্রতি-

চরম লাঞ্ছনা অপমান,

ইতিহাস তাই ক্ষমা করবেনা কোনদিন। 

তোমাদের দু’হাত আজ রক্তে রঞ্জিত,

রক্ত মাখানো হাত জোড় করে

ক্ষমা চাইছ বিধাতার কাছে? কিন্তু-

ক্ষমা তুমিত পাবেনা ইয়াহিয়া,

বাংলার জনতা কোনদিনই তোমায়

করবেনা ক্ষমা।  লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালীর

প্রস্ফুটিত জীবনকে হত্যা করেছ,

পান করেছ তাজা রক্ত,

ইতিহাসের কলঙ্ক তুমি!

ক্ষমা পেতে চাও কি ইতিহাসের পাতায়?

কোনদিন তুমি পাবেনা ক্ষমা। 

১৮/০৮/৭১ সাল। 

(৪৮)

“মুক্তির প্রতিক”

বঙ্গবন্ধু তুমি বাংলা মায়ের বিদ্রোহী

মুক্তি ছেলে, বেঈমান পশ্চিমা

কুত্তার অত্যাচারে মাতৃভূমি ছেড়ে

যেতে বাধ্য হয়েছ, দেশকে রক্ষায়

জন্ম নিয়েছ মুক্তির প্রতীকে। 

শপথ নিয়েছ মায়ের চরণ ধরে,

তাই দীর্ঘায়ূ কামনা করি

খোদার কাছে দুহাত তুলে,

হানতে হবে কঠিন আঘাত। 

ভাংতে হবে প্রাসাদ মুছে ফেলতে হবে

শত্রুকে জন্ম ভূমির মাটি থেকে। 

সেই দুর্জয় শপথের বাণী বাংলার আকাশে

বাতাসে ধ্বনিত হয়ে ফিরছে

অগ্নি স্ফুলিঙ্গের ন্যায় দিকে দিকে। 

বঙ্গবন্ধুর অগ্নিমন্ত্রে বাংলার মানুষ

উদ্বুদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তির সংগ্রামে। 

‘রক্ত দিয়েছি আমরা আরও রক্ত দেব

বাংলাকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ’

মুজিবের অমর বাণী কন্ঠে নিয়ে

প্রতিটি মুক্তিকামী রণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ,

কুত্তাদের বিষদাঁত ভেঙে দেবার জন্যে

বাংলার মাটিতে চলছে শত্রু নিধন পালা,

বেজে উঠেছে রণ দামামা; ঝংকার তুলেছিল

সেদিন তুর্কী বীর কামাল পাশার কন্ঠে,

সে সুর আজ শেখ মুজিবের কন্ঠে দোলে। 

কঠিন পাথরের বুক চিরে মহামানবের

কন্ঠ ধ্বনি উতখিত আজ শক্তি জুগিয়ে চলে,

তালে তালে চলার পথে, মুক্তির প্রতীক রুপে

সে কে? বাংলার নয়ন মণি বঙ্গবন্ধু

 

শেখ মুজিবুর রহমান!

২২/০৮/৭১ সাল। 

 (৪৯)

 “জীবন নিয়ে খেলা”

একটি সুপ্ত শিশু অবোধ চিত্তে

ঘুয়াচ্ছে ধরণী ধাত্রীর গর্ভে-

নিষ্পাপ শান্ত কচি মমতার

কচি মনের খেয়ালি স্বপন

হঠাৎ যেন কোন নিষ্ঠুর দানবের

মহাশক্তির টানে ঘুম ভেঙে গেল,

বিস্ময়ে নির্লিপ্ত অনির্বান দুটি আখী তার

করুণ চিত্তে তাকিয়ে রয় পৃথ্বীরাজের পানে,

অবুঝ ভাষাহীন শিশুটি এবার

অব্যক্ত রবে তার ওষ্ঠ কাঁপিয়ে

পৃথ্বীরাজের নিকট প্রশ্ন করে-

‘কি অপরাধ করেছিলাম তাই,

আমাকে নিঠুরের মত ফুলের বৃন্ত

থেকে অমন করে ছিনিয়ে আনলে?

কই জবাব দাও-

যদি অমন করে ছিনিয়ে আনবে

তবে, কেন সৃষ্টি করেছিলে

জান্নাতের প্রতীক হিসাবে? জানি-

তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিতে

পারবে না, তুমি সৃষ্টিকর্তা,

তুমি সৃষ্টি করে সৃষ্টিকে ছুড়ে ফেলে

টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে

আবার তাকে জোড়া লাগানো

তোমার কাজ, তাইনা?

কোন কিছু সৃষ্টি করে তাএ আবার-

ভেঙে ফেলার মানে কি বলতে পার?

কই! পৃথ্বীরাজ আমার প্রশ্নের

জবাব দিচ্ছনা যে! জানি-

কেও আমার প্রশ্নের জবাব

দেবে না, তবে কেন কেন

অমন করে আঘাতের পর আঘাত

হেনে চলেছ এ নরম বুকে!

সৃষ্টি জগতে আমাদের মত কত

ফুলকেই না তুমি বৃন্তথেকে

ছিন্ন অকাল সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছ

তা নজির বিহীন, কি বলতে চাও?

আমাকে যদি অমন করে তোমার

হাতের পুতুল করে রাখ-তাহলে

আম কি করব জানো? শোন-

সৃষ্টির সব কিছুকে ভেঙে

চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেব’। 

তুমি যখন আমাকে সৃষ্টি করে

পাঠিয়েছ এ ধরায়, তখন

সে শক্তি দিয়েছ আমায়,

তাই-এ অমূল্য জীবনকে নিয়

 ছিনি মিনি খেলা পছন্দ করিনা। 

২৩/০৮/৭১ সাল। 

(৫০)

“দ্রোহী”

বিদ্রোহী আমি আজ

অত্যাচারীর খড়গ নামিয়ে দিয়ে

প্রতিষ্ঠিত করব আলোর সত্য,

জালিমের কবর দিয়ে বাঁচিয়ে রাখব

ন্যায় সত্যকে; আমি সব্যসাচী

আমি মানিনা তোমাদের ন্যায়

ভন্ড কাপুরুষের আইন, সারা

বিশ্বকে পুড়িয়ে করব ছারখার!

আমি রুদ্র কাল বৈশাখী, আমার

ঝড়ের দাপটে করব ছিন্নভিন্ন,

অত্যাচারিকে ভাসিয়ে দেব

রক্তাক্ত বন্যায়, ধনীদের

অট্টালিকা প্রাসাদ, আমি কন্টক

আমি দ্রোহী আমি পরোয়া

করিনা কোন বাঁধা বিপত্তি; মানিনা-

কোন বন্ধুরতা, যে পথে চলি

সে পথ পরিণত করি মহাশ্মশান,

আমি অক্ষয়ের কবি তাই

কাব্যিকের ছন্দে বাংলাকে সাজিয়ে তুলি,

আমি বিভীশিখার যম যেন বিশুভিয়াস

নজরুলের বিদ্রোহীর  অগ্নিশিখা, তোমাদের

রাজপ্রাসাদকে পুড়িয়ে শেষ করতে এসেছি। 

সেইত আমার কাজ কলম দ্রোহী আমি

ধ্বংস করি তোমাদের অন্যায় সৃষ্টি,

সৃষ্টি করি প্রজন্মের নতুন কল্যাণ পথ,

জাগাতে সুপ্ত শিশুকে যারা আসবে এ আশায়। 

২৬/০৮/৭১ সাল। 

(৫১)

 “খবর”

খবর! খবর! কিসের খবর!

দেশের না কি বিদেশের! মনটা এক

অজানায় বেদনায় কেটে ওঠে

কিসের খবর জানার জন্যে!

মনটা অস্থির চঞ্চল শঙ্কিত

অজানা ভয়ের দাপটে!

 দরজা খোলা রাস্তায় লোক

চলাচল দেখা যায়,

সবারই মুখে ম্লানের ছায়া,

বাইরে তাকাই হকার

কাগজ দিয়েছে না কি;

না দিতে আসছে দেখতে। 

না আর পারিনে’ রেডিওটা মোড়া দেই-

খবর হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রে,

কিন্তু একি অন্যায়; নিষ্ঠুর নরহত্যা,

শুনতে পারিনা আর তাই বন্দ করে দেই। 

কিছু পরে হকার ঘরে প্রবেশ করে

কাগজ রেখে যায় নিঃশব্দে। 

মুখটি তার শুষ্ক দেখছি, নিরবে

মেলি চোখের সামনে কিন্তু একি!

বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ঢাকায়

রক্তের বন্যা বইছে... হাজার হাজার

মানুষ নিহত...ছুটে পালাচ্ছে হাজারে

হাজারে; পড়তে পারিনা আর দু’চোখে!

বন্ধ করে বসে থাকি নীরবে

সহসা দূর থেকে ভেসে আসে

‘পালাও পালাও’! খবর খবর!

ঘরের জানালা দরজা বন্দ করি,

তারপর-দু’কান চেপে চেয়ারে

বসি।  বাতাসের শো শো শব্দে

ছড়িয়ে যাচ্ছে খবর খবর দেশের খবর!

২৮/০৮/৭১ সাল। 

(৫২)

 “ঘুমের ছায়া”

থেমে গেছে বাংলার আর্ত চিৎকার

নেমে এসেছে ঘন কালো রাত্রির ছায়া,

মিশে গেছে সবকিছু অমানিশার

কালো আঁধারে; কি যেন খুঁজি হাতড়িয়ে

খুঁজে ফিরছি ঘুমের মাঝে, যেন

সে ধরা দিতে চেয়েও তবু চায়না। 

কোথাও কোন দীপ  পড়েনা চোখে,

শুধু জোনাকিরা টিপটিপ করে

জ্বলছে আর নিভছে; মাঝে

মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে

রাত জাগা নিশাচর পাখির মাথাকুটা

ক্রন্দন! সমস্ত রাত ধরে যেন সে

গভীর নিদ্রায় নিদ্রাভিভূত, মনে হচ্ছে-

অমানিশার আড়াল থেকে কোন

দানব শক্তি তার বাহু মেলে বসে

আছে এ ধরাকে বোটা থেকে টেনে

ছিঁড়ে নিঃশেষে মুছে ফেলবে; তার

পাপের কলঙ্ক কালিমা থেকে। 

২৯/০৮/৭১ সাল। 

(৫৩)

 “সময়ের দাবী”

সময় দাড়াও আমিও যাব-

তোমার সাথে, এ কলুষিত পৃথিবীতে

আর পারছিনাত’ দাড়াতে,

দিকে দিকে অনাচার আর অত্যাচার

নরহত্যার বিভিশিখার দীপ জ্বলছে,

আশ্চর্য! তুমিত’ সত্যের লাগি

চলে গেলে অভিমান করে,

যাবেই’ত সময় কারও জন্য

করেনা অপেক্ষা; কেন কেন

অপেক্ষা করবে! ভাই সময়-

তোমার মত নদীর স্রোতও

কারও জন্য করেনা অপেক্ষা। 

জগতের কলুষ স্পর্শ কর না কর’

তুমি খুব হিসেবী, তুমি যে

কর্তার হুকুম পালনকারী,

তুমি এক এক করে কর্তব্যে

তাগিদ দিয়ে থাক। 

তোমার জীবন আবর্তমান

জগতের মানুষ ধাপে ধাপে

এগিয়ে চলে সামনের পানে,

তুমি কেন অন্যের জন্য অপেক্ষা করবে!

তোমার জন্য’ত অপেক্ষা করে এ ধরণী,

মালির কর্মসূচী তুমি সময় তুমি,

খবরের আবহমান গতিস্রোত। 

৩০/০৮/৭১ সাল। 

(৫৪)

 “বাঙ্গালী জাতি” 

পূব দিগন্তে ঐ রক্তিম সূর্য রাঙায়ে

বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা,

রাগিণীর সুরে ওরা দামামা বাঁজায়ে

চলেছে ছুটে ওঁরা আজি বিশ্ব সেরা। 

মৃত্যু ভয় ঠেলে সবাই আজি

জীবন সুখ ফেলে দিয়ে। 

যুবা শিশু সেনাদল সাজি,

ছুটে চলি নিশান উড়িয়ে। 

স্বাধীনতা সংগ্রামে মোরা বাঙ্গালী জাতি,

করেছি প্রতিরোধ তাই মৃত্যুর কঠিন বজ্র। 

হিন্দু মুসলিম মোরা এক সাথে পাতি,

একে একে সবে মৃত্যুর কঠিন রজ্জু। 

মোদের দাপটে কাঁপে আজি বিশ্ব,

ভাঙিয়া আজি তাই করিবে একাকার। 

শত্রুর কাছে হইয়াছি মোরা নিঃস্ব,

তাই ওদের বুঝি আজি নাহি নিস্তার। 

এবার মোদের শক্ত শাবল হাতুড়ী দিয়ে,

ঝাঁটিয়ে দেব শত্রুকে কন্টক পথ পেরিয়ে। 

বিশ্ববাসীর জানিয়ে দেব আমরা সেরা জাতি,

সংগ্রামী আর ভালবাসায় বিশ্বকে করেছি জ্ঞাতি। 

। ।  সমাপ্ত। ।