১:১০ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০২০, শনিবার | | ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

মানব পাচার রোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

২৮ জুলাই ২০২০, ০৮:২৬


ইকতেদার আহমেদ

মানুষ আদিকাল থেকেই জীবিকার অন্বেষণে এক স্থান থেকে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে।  কাল ও যুগের পরিবর্তনে এবং বিবর্তনে পৃথিবীর সর্বত্র কমবেশি উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও মানুষের এ পাড়ি দেয়ার ধারা এখনো অব্যাহত আছে।  পৃথিবীর যেসব অঞ্চল সুদূর অতীত থেকে বিশাল জলরাশি দ্বারা বর্তমানের ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন সেসব অঞ্চল প্রায় জনমানবহীন ছিল।  যেমন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি।  সুদূর অতীতে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে যেসব অঞ্চল সহজভাবে জীবনযাপনের উপযোগী সেসব অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিল এবং নগরের পত্তন হয়েছিল।  সে সময় বর্তমানের এ তিনটি মহাদেশের মধ্যে ইউরোপ ছিল সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত।  সে সময়ে জীবন ও জীবিকা সম্পূর্ণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং সে কারণেই কৃষিপণ্য অধিক উৎপন্ন হয় এমন সব এলাকাকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সমাগম ঘটত। 

পৃথিবীতে আদিকাল থেকে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের নেশায় মত্ত ছিল।  এ কাজটি করতে গিয়ে শক্তিশালী জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কাছে দুর্বল জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় পরাভূত হয়ে নিজ এলাকা হতে বিতাড়িত হয়েছে।  এরূপ বিতাড়িত বহু জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় বিরান ভূমিতে নিজেদের আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।  আবার অনেক জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়কে দেখা গেছে আবাসভূমি হিসেবে পাহাড়, পর্বত বা দুর্গম এলাকাকে বেছে নিতে। 

আদিম সমাজব্যবস্থায় যে দাসপ্রথা ছিল সময়ের বিবর্তনে তার পরিবর্তন হলেও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে এমন বলা যাবে না।  দাস প্রথা অবসানে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকলেও আজ ইসলামী রাষ্ট্র নামে পরিচিত বা মুসলিম অধ্যুষিত এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে দাসপ্রথা নতুন করে আবির্ভূত হয়ে অতীতের গ্লানিময় জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। 

দারিদ্র্যপীড়িত ইউরোপের অধিবাসীদের মধ্যে ব্রিটিশরা নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে সারা বিশ্বে তাদের উপনিবেশ স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল।  ব্রিটেনে স্থাপিত শিল্প কারখানার কাঁচামাল সরবরাহের জন্য তাদের বিভিন্ন উপনিবেশে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের আবশ্যকতা দেখা দেয়।  ব্রিটিশরা এক উপনিবেশের অধিবাসীদের অন্য উপনিবেশে নিয়ে কৃষি কাজে নিয়োজিত করে তাদের শিল্প কারখানার জন্য কাঁচামালের জোগান অক্ষুণœ রেখেছিল।  ব্রিটিশরা আমেরিকায় তাদের উপনিবেশ স্থাপন পরবর্তী সেখানকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষিতে শ্রমের প্রয়োজনে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে ব্যাপক হারে মানব পাচার করে।  একই সময়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, মাদাগাসকার, মরিশাস প্রভৃতিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষিতে শ্রম দেয়ার জন্য ব্যাপক হারে মানব পাচার করা হয়।  আজ থেকে ১০০-৪০০ বছর আগে পাচারকৃত এসব মানুষ বংশপরম্পরায় পাচারকৃত দেশে বসবাস করে সেসব দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মূল স্রোতধারার নাগরিকদের সাথে সমঅধিকারের ভাগিদার। 

অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো মানুষ নিজের ভূমিতে শ্রম দিয়ে ফসল উৎপন্ন করে জীবিকা নির্বাহের জন্য সচেষ্ট থাকে।  সেটি যখন সম্ভব হয় না তখন বর্গাচাষি হিসেবে পরভূমে শ্রম দিয়ে ফলস উৎপন্ন করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।  পরভূমে শ্রম দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ভূমি যখন না থাকে তখন দেখা যায় জীবিকার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও মানুষ অন্যত্র গিয়ে কাজ খোঁজার চেষ্টা করে। 
বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনবহুল দেশ।  বাংলাদেশে বেকার সমস্যা প্রকট।  বিগত তিন দশকে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটলেও জনসংখ্যানুপাতে তা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে সমর্থ হয়নি।  বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলা শহরে বিপুল কৃষি শ্রমিক রিকশা চালানোর কাজে নিয়োজিত।  এসব রিকশা শ্রমিকে অন্য কোথাও বিকল্প শ্রম দেয়ার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা রিকশা চালানোর পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। 

বাংলাদেশের বিপুল শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ও মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।  অতীতে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও মালয়েশিয়ার উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করত।  ২০০৯ সালের পর থেকে বিভিন্ন কারণে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং বিগত কয়েক বছর যাবৎ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বলতে গেলে অনেকটা বন্ধ।  মালয়েশিয়াতে তিন বছর আগে পর্যন্ত যখন প্রতি বছর ২ লক্ষাধিক শ্রমিক যেত এখন তা সীমিত হয়ে এসেছে।  মালয়েশিয়ায় বর্তমানে জিটুজির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হয় এবং গত তিন বছর এ প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষে নগণ্যসংখ্যক শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয়েছে। 

একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ তখনই বলা যায় যখন প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকে।  আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হচ্ছে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে বেকার সমস্যা হ্রাসের দিকে দেশ দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে; কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।  এখনো অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যায় না।  বিদ্যালয় বিমুখ এ সব শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করতে সরকার সফল হয়নি। 

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা সামগ্রিক জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি।  বর্তমানে আমাদের যে প্রবৃদ্ধির হার তা দু’অঙ্কে পৌঁছানো না গেলে বেকার সমস্যা লাঘবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার্যকর অবদান রাখতে ব্যর্থ হবে।  আর বাস্তবে যে ব্যর্থ তা এ দেশের মানুষের মরিয়া হয়ে বিদেশের উদ্দেশে পাড়ি জমানোর ঘটনা থেকে স্পষ্ট। 

বাংলাদেশ থেকে স্থল, নৌ ও আকাশ এ তিন পথেই অবৈধ অভিবাসনের ঘটনা ঘটে।  আকাশপথে যারা যায় তারা সাধারণত বৈধ ভিসায় একটি দেশে গিয়ে পরে সেখান থেকে অন্য দেশের উদ্দেশে পাড়ি জমায় অথবা ওই দেশে আত্মগোপনে থেকে কম মজুরির কাজে নিয়োজিত হয়।  এদের মধ্যে ভাগ্যবান যারা তারা হয়তো এভাবে কয়েক বছর কাজ করার পর বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।  স্থলপথে যারা যায় তারা সাধারণত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থলসীমানা দিয়ে প্রথমে ভারতে যায় এবং তাদের অনেকে ভারতের মুম্বাই , দিল্লি প্রভৃতি শহরে নিম্ন মজুরির পেশায় নিয়োজিত হয়।  আবার অনেকে ভারত হয়ে পাকিস্তান, ইরান অথবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিম্ন মজুরির পেশায় নিয়োজিত হয়।  নৌ বা সমুদ্রপথে ২০০২ সাল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দেয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেছে।  মালয়েশিয়ায় এখনো কৃষিকাজে বিপুল শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে।  একজন শ্রমিক বৈধ পথে মালয়েশিয়া গিয়ে কৃষি কাজে নিয়োজিত হলে তাকে যে পরিমাণ মজুরি দিতে হয় অবৈধভাবে যাওয়া এমন শ্রমিককে তার অর্ধেক বা অর্ধেকের চেয়ে কম মজুরি দিয়ে নিয়োগ দেয়া যায়।  আর এ কারণেই মালয়েশিয়ার ভূমি মালিকরা সরকারকে এড়িয়ে সঙ্গোপনে স্বল্প মজুরিতে অবৈধ পথে আসা অভিবাসীদের কৃষি কাজে নিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী। 

বর্তমান মিয়ানমারের সাবেক নাম বার্মা।  বার্মার ১৪টি প্রদেশের মধ্যে একমাত্র আরাকানই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ ছিল।  বার্মার ৭০ লাখ মুসলমানের অর্ধেকের বেশি আরাকানের অধিবাসী।  মিয়ানমারের আরাকানে বসবাসরত মুসলিমরা রোহিঙ্গা নামে অভিহিত।  তারা দুই শ’ বছরেরও অধিক সময় যাবৎ ব্রিটিশ শাসনামল থেকে সে দেশের অধিবাসী।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনুসৃত নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী যেসব শর্ত পূরণ করলে একজন নাগরিক একটি দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য যোগ্য দুঃখজনকভাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সেসব বিধিবিধানকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করে সে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে অনীহ।  আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমরা সে দেশে এমন নিপীড়নের শিকার যে, আজ সেখানে তাদের জন্য সে দেশে বসবাস করা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  বর্তমানে আরাকানের ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশের কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার আনুকূল্যে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। 

তা ছাড়া শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে।  রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য আরাকান ও বাংলাদেশ উভয় স্থানে বসবাস নিরাপদ নয় এ কারণে রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের অভিবাসীদের সাথে বিপদসঙ্কুল সমুদ্র পথে ভিন্ন দেশের উদ্দেশে পাড়ি দেয়ার জন্য মরিয়া।  সম্প্রতি থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সমুদ্র উপকূলে ভাসমান প্রায় ৮-১০ হাজার যে অভিবাসীর সন্ধান পাওয়া গেছে এদের মধ্যে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ বাংলাদেশী এবং অবশিষ্টাংশ আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিম।  রোহিঙ্গা মুসলিমরা দেশে তাদের অবস্থান একেবারেই নিরাপদ নয় আর অপর দিকে বাংলাদেশও তাদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণে অনাগ্রহী এ কারণে নারী ও শিশুসহ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পরিবারসমেত অজানা গন্তব্যের বিদেশের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন।  সাগরে ভাসমান বাংলাদেশের ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীরা আজ বিশ্ব গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। 

বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অভিবাসী হিসেবে আজ যারা সাগরে ভাসমান সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ, ১৯৮২ অনুযায়ী তাদের প্রতি সাহায্যের হাত প্রশস্ত করা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সরকারের আবশ্যিক কর্তৃব্য ছিল।  আর এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এ দু’টি দেশও নিজ নিজ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। 

আজকের এ অভিবাসী সমস্যাসহ যেকোনো অভিবাসী সমস্যাই প্রকৃতপক্ষে মানবিক বিপর্যয়।  এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।  আর তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ অভিবাসনের সাথে যেসব দেশ সম্পৃক্ত এদের সবার সমন্বিত উদ্যোগই দিতে পারে এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান। 

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com