১১:৫৯ পিএম, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, মঙ্গলবার | | ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

মার্কিন গণতন্ত্রের শক্তি এখনো অটুট

১৩ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:০০


মুজতাহিদ ফারুকী

মার্কিন গণতন্ত্রের শক্তি এখনো অটুট - ছবি : সংগৃহীত

গত ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে কংগ্রেস ভবন বা ক্যাপিটল হিলে হামলা হয়েছে।  নির্বাচনে পরাজিত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উসকানিতে তার সমর্থকরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার অবতারণা করে।  তারা কংগ্রেস ভবন দখল করে নেয়, সেখানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।  এই ঘটনায় পুলিশের একজন সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হয়।  অনেকে ওই ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেছেন।  এটা সত্যি, দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির নেই।  কিন্তু এটি আদৌ নজিরবিহীন নয়।  ১৮১৪ এবং ১৮৬১ সালে একইরকম হামলা হয়েছিল এই ভবনে। 

১৮৬১ সালের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  সে বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ওই হামলার ঘটনা ঘটে।  এরও তিন মাস আগে পপুলার ভোটে বিজয়ী হন আব্রাহাম লিঙ্কন।  এদিন ছিল কংগ্রেসে লিঙ্কনের পক্ষে ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের অনুমোদনের দিন।  সেই ভোটাভুটি প্রতিহত করার উদ্দেশ্যেই হামলার ঘটনা ঘটে যেমনটা এবার ঘটল। 

যাই হোক, হামলা হলেও বিজয়ী জো বাইডেনের প্রত্যয়ন ঠেকে থাকেনি।  বরং তীব্র উল্টো প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।  হামলার সব দায় এককভাবে ট্রাম্পের ওপরই বর্তাচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধে আবারো অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।  তার মন্ত্রিসভা এবং হোয়াইট হাউজের বেশ ক’জন স্টাফ সদস্য পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।  ট্রাম্প যাতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে না পারেন সে জন্য সেনাপ্রধানের সাথে কথা বলেছেন কংগ্রেসের স্পিকার।  এর চেয়ে অসম্মানজনক আর কী ঘটতে পারে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য? অবস্থা বেগতিক দেখে ট্রাম্প পরাজয় মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে মনোযোগ দেয়ার কথা বলছেন। 

ক্যাপিটল হিলে হামলার পর অনেকেই এটিকে আমেরিকার গণতন্ত্রের পতনের আলামত হিসেবে দেখছেন।  কেউ বা বলছেন, আমেরিকার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার আর কিছু অবশিষ্ট নেই।  সন্দেহ নেই, আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশে এমন একটি উগ্রবাদী সহিংসতার ঘটনা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।  ওই দেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশী বিশ্লেষক বলেছেন, ট্রাম্পের শাসনকালের চার বছরে আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে এই সন্ত্রাসী তৎপরতায়।  এই ঘটনা গণতন্ত্রচর্চায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা তুলে ধরেছে।  তার ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদের গণতন্ত্রের আদর্শ ও চর্চার কথা বলতে পারে কি না।  কিন্তু মার্কিন গণতন্ত্রের গতি যে কর্দমাক্ত জলাভূমির চোরাবালিতে আটকা পড়তে শুরু করেছে তার লক্ষণ তো আজকের নয়।  যুক্তরাষ্ট্র যতই মুখে গণতন্ত্রের কথা বলুক, কার্যত দেশটি যে বিশ্বের নেতা হিসেবে অন্যায্য ও বলপ্রয়োগের নীতি চালিয়ে এসেছে, তা তো কখনোই অস্পষ্ট বা লুকোছাপার বিষয় ছিল না।  আমাদের কৈশোরকাল কেটেছে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার জনতার মিছিল ও স্লোগান শুনে।  সিলভেস্টার স্ট্যালোনের র‌্যাম্বো স্টইলের একেকটি মারদাঙ্গা ছবির বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে একের পর এক দেশে মার্কিন শক্তি প্রদর্শন, নির্বিচার আক্রমণ, হত্যা ও লুণ্ঠনের ধারাবাহিকতায়।  ফলত আমেরিকার ধবল অবয়বে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একটি বীভৎস দানবের চেহারাই বিশ্ববাসী দেখে এসেছে গত প্রায় ৭০ বছর ধরে।  আর এই বিষয়টি মার্কিন সমাজ ও ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করেছে বছরের পর বছর ধরে।  সে জন্যই সে দেশের গণতান্ত্রিক ময়দানে জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়রের মতো এবং সবশেষে ট্রাম্পের মতো দুর্বৃত্তের জন্ম হতে পেরেছে।  ধস তো সেদিন থেকে শুরু যেদিন সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাতে দেশটি ইরাকের ওপর সামরিক হামলা চালায় এবং দেশটিকে ধ্বংস করে দেয়।  এর পর আফগানিস্তান হয়ে ওঠে তার আরেক মারণক্ষেত্র।  মধ্যপ্রাচ্যের আরেক বধ্যভূমি ফিলিস্তিন।  সেখানে একের পর এক অন্যায় ঘটে চলেছে ফিলিস্তিনি জাতির ওপর আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে। 

এবারের মার্কিন নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গেছে, আমেরিকার গণতান্ত্রিক হৃদযন্ত্রে পচন ধরেছে।  ট্রাম্পকে ঠেকানোর জন্য গণতান্ত্রিক শক্তি যখন মরিয়া হয়ে বাইডেনকে ভোট দিয়েছে তখন অগণতান্ত্রিক শক্তিও পিছিয়ে থাকেনি।  দেখা গেছে, বাইডেন যা ভোট পেয়েছেন তার চেয়ে ট্রাম্পের পাওয়া ভোট খুব কম নয়।  অর্থাৎ গণতন্ত্রের ভেতরে থেকেই অগণতান্ত্রিক শক্তি প্রায় সমানে সমানে এগিয়ে গেছে।  ট্রাম্পের চার বছরে বর্ণবাদী হয়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।  যারা আগে বর্ণবিদ্বেষ লুকিয়ে রাখত, এখন তারা সেটি প্রকাশ্যে বলার এবং কাজেকর্মে করে দেখানোর মতো অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে।  মাফিয়া ধরনের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সংগঠনগুলো শুধু আমেরিকায় নয়, ইউরোপেও রীতিমতো সোচ্চার ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।  সম্প্রতি ইউরোপের দেশে দেশে নির্বাচনে বর্ণবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। 

এমনই এক পরিস্থিতিতে আমেরিকায় গণতন্ত্রবিরোধী ও বর্ণবাদী সহিংস মন-মানসিকতার বিস্তার সহসাই থমকে যাবে এমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই।  ট্রাম্প যে রিপাবলিকান দলের নেতা, সে দলটি আগাগোড়াই ট্রাম্পের সব অপকর্মে সমর্থন দিয়ে এসেছে।  ভবিষ্যতেও দেবে, তাতে সন্দেহ নেই; যদিও কংগ্রেসের রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতাসহ অন্তত ১৫ জন ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগে সমর্থন দেবেন বলে জানিয়েছেন।  বাস্তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সে দেশেরই শীর্ষ গণমাধ্যম।  পার্টির অনেক নেতা, এমপি, সিনেটর ভবিষ্যতে দলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন সিনেটে বাইডেনের বিজয় প্রত্যয়নের বিরোধিতা করে।  সুতরাং চোখ বুঁজে বলে দেয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র সহিষ্ণু গণতন্ত্রের চর্চায় ফিরে যাবে- এমন সম্ভাবনা কম। 

তার পরও আমরা মার্কিন দেশটির গণতন্ত্র নিয়ে এখনই হতাশ হওয়ার খুব কারণ দেখি না।  যে ধস নেমেছে সেটা যদি অব্যাহতও থাকে তবু দেশটির পক্ষে তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের মতো একনায়কতন্ত্রী বা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট ক্ষীণ।  ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনার পর যারা মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তাদের সাথে দ্বিমত করেই বলি, ট্রাম্প যেভাবে নির্বাচনী ফল পাল্টে ফেলার প্রয়াস পেয়েছেন, যেভাবে একাধিক রাজ্যের নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিজে ফোন করে তাকে বিজয়ী ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছেন সেটি কিন্তু সফল হয়নি।  সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেটি ব্যর্থ করে দিয়েছেন।  একজন প্রেসিডেন্টের নির্দেশ নাকচ করে দেয়ার এই শক্তি তাদের কে জুগিয়েছে? সেটি গণতন্ত্র।  তারা জানতেন, দেশে আইন-আদালত আছে এবং বিচারব্যবস্থা নিজরূপে।  সুতরাং প্রেসিডেন্টের অন্যায় আদেশ মানতে তারা বাধ্য নন।  সুপ্রিম কোর্টসহ সব রাজ্যের আদালতও ট্রাম্প ও তার দলের সব মামলা অগ্রাহ্য করেছেন।  বলেছেন, নির্বাচনে কারচুপির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগ আমলে নেয়ার প্রশ্নই আসে না। 

একই সাথে দেশটির গণমাধ্যমের শক্তিমত্তার বিষয়টিও মনে রাখুন।  খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট দিনে কয়টি মিথ্যা কথা বলছেন সেই হিসাব তারা নিয়মিত প্রকাশ করছেন।  প্রেসিডেন্টের নানা অপকর্মের বিস্তারিত ফিরিস্তি তুলে ধরছেন একেকটি রিপোর্টে।  নির্বাচনের ফল পাল্টে দেয়ার জন্য টেলিফোনে নির্দেশ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট।  সেই টেলিফোন সংলাপের ভিডিও প্রকাশ করে দিচ্ছে সংবাদপত্র।  সম্প্রতি ট্রাম্পের এ ধরনের তিনটি ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে।  এসব সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কিছু মামলা-মোকদ্দমা অথবা হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে কোনো কোনো সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে।  মারাত্মক হুমকিও এসেছে নানা সময়ে।  কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানও সরকার বন্ধ করে দিতে পারেনি।  দলীয় কর্মী দিয়ে হামলা করতে পারেনি সংবাদপত্রের দফতরে অথবা সাংবাদিকের ওপর।  ধরে নিয়ে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে দিতে পারেনি।  সত্য বলার পর সাংবাদিককে কেঁদেকেটে হাত জোড় করে বলতে হয়নি, ‘আমাকে মাফ করে দিন, প্রাণে মারবেন না, আর কখনো খবর প্রকাশ করব না’।  সত্য বলার এই হিম্মত মার্কিন দেশের গণতন্ত্রের শক্তি।  এই শক্তির জায়গাটি উপলব্ধির মতো মন যদি আমাদের না থাকে, তাহলে বলার কিছু নেই।  উপরে যে কথাগুলো বলা হলো, সেগুলো নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে রেখে বিবেচনা করুন, আর কিছু না হোক, ভাবার খোরাক অন্তত পাবেন। 

যে কথা বলছিলাম।  ট্রাম্পের আচরণের বিরূপ প্রভাব সারা বিশ্বে এবং তার নিজ দেশে অবশ্যই পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই।  এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে তা স্পষ্ট।  ভারতের মতো একটি বিশাল গণতন্ত্রের দেশ হয়ে গেছে চরম স্বৈরতান্ত্রিক।  ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বর্ণবাদ সেখানে সমাজের গভীরে পৌঁছে গেছে।  সর্বোচ্চ আদালতের শীর্ষ ব্যক্তিকেও পুরস্কারের বিনিময়ে কিনে ফেলার মতো ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।  অথচ আমেরিকায় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কিনতে পারেননি ট্রাম্প।  আমাদের সুনিশ্চিত প্রত্যয় এমনই যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে যতদিন নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ থাকবে, যতদিন সেখানে আইনের শাসন থাকবে, যতদিন স্বাধীন গণমাধ্যম টিকে থাকবে, ততদিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াও চলমান থাকবে।  তবে আমেরিকারই বহু থিঙ্কট্যাঙ্ক যাদের মধ্যে ওয়াশিংটনের ফ্রিডম হাউজও আছে, বলছে যে- বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্র এখন অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু।  ফ্রিডম হাউজের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের প্রকাশনার সর্বশেষ সংখ্যা সম্প্রতি বেরিয়েছে।  তাতে বলা হয়েছে- ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যতটা ফ্রিডম ছিল তাতে দেশটি ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিল ৯৪।  অবস্থান ছিল জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার পরেই।  ২০২০ সালে এসে দেশটিতে সেই ফ্রিডম বা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা আট পয়েন্ট হারিয়েছে।  প্রোটেক্ট ডেমোক্র্যাসি নামের একটি আইনি ওয়াচডগও বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের অবনতির একই রকম পূর্বাভাস দিয়েছে।  বলেছে, ২০০৫ সালের পর বিশ্বে গণতন্ত্রের ক্রমাবনতি ঘটেছে। 

গণতন্ত্রের এই অবনতি একটি চলমান প্রক্রিয়া।  হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বকে নতুন কোনো বিশ্বব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।  গণতন্ত্রের পরিবর্তে অন্য কোনো ব্যবস্থা কায়েম হতে পারে।  কিন্তু এই মুহূর্তে মার্কিন গণতন্ত্রের ধসে পড়ার কোনো কারণ ঘটেনি।