১০:৪৮ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার | | ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

হুমকিতে কাজ হলোনা অপসারণ শুরু

১৪ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩০


এক সময় রাজধানীতে ক্যাবল সংযোগ নিয়ে প্রায় সময় সংঘাত-সংঘর্ষ এমনকি আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটতো।  ক্যাবল সংযোগের সেই রমরমা ব্যবসা এখন আর আগের মতো নেই।  তবে তথ্য-প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ফলে উদীয়মান এই ব্যবসায় সেই ব্যবসায়ীদের অনেকেই যুক্ত হয়েছেন।  ব্যবসা পরিবর্তন হলেও আইন-কানুনের তোয়াক্কা, সরকারের নির্দেশ-নির্দেশনা আগের মতোই তাদের কাছে নস্যি।  দিনের পর দিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশনা দিলেও কোন কিছুকেই পাত্তা দেয় না ইন্টারনেট ও ক্যাবল সংযোগ ব্যবসায়ীরা।  অনেক ক্ষেত্রে সরকারও তাদের কাছে অসহায়।  যখনই কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের অনিয়ম, অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে তখনই তারা শুরু করেন হুমকি-ধামকি দেয়া।  গ্রাহকদের জিম্মি করে আদায় করেন অনৈতিক দাবিও। 

গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নগরীর ঝুলন্ত তার অপসারণে উদ্যোগ নেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।  ৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে ইতোমধ্যে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকার সড়ক থেকে তার অপসারণ করা হয়েছে।  দক্ষিণের এই উদ্যোগ দেখে যুক্ত হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও।  কিন্তু নগীর সৌন্দর্য্য বর্ধনের এই উদ্যোগে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএসপি ও ক্যাবল অপারেটররা।  সিটি করপোরেশন তার অপসারণের পর পরই তারা আবারও তার টেনে সংযোগ সচল করছেন।  তার অপসারণ অভিযান বন্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চাপ দেয়ার চেষ্টা করছেন।  কিন্তু তাতেও কোন কাজ না হওয়ায় এবার সারাদেশের গ্রাহকদের জিম্মি করে ইন্টারনেট ও ডিস সেবা বন্ধের হুমকী দিয়েছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ও ক্যাবল অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। 

গত সোমবার আইএসপিএবি ও কোয়াবের এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, দক্ষিণ সিটির তার অপসারণে গত দুই মাসে আনুমানিক ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আইএসপিএবি ও কোয়াবকে।  সৌন্দর্য বর্ধনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও আগাম নোটিশ না দিয়ে, কয়েক লাখ ইন্টারনেট ও ক্যাবল টিভি গ্রাহকের সেবা নিশ্চিত না করে কোটি কোটি টাকার ঝুলন্ত ক্যাবল অপসারণ কোনো যৌক্তিক সমাধান নয় বলেও মনে করে তারা।  এর ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পাশাপাশি বেকার হয়ে পড়বেন এক হাজার বৈধ আইএসপি ও কোয়াবের প্রায় লক্ষাধিক কর্মী। 

তারা দাবি করেন, প্রতি ২০০ মিটার অন্তর এলডিপি (লোকাল ডিসট্রিবিউটর পয়েন্ট বা পিওসি-পয়েন্ট অব সেল) বসানো উচিত হলেও মাঠ পর্যায়ে করা জরিপে আমরা দেখতে পাই, এনটিটিএন প্রায় ১-২ কি.মি অন্তর বসিয়েছে।  এতে ২০০ মিটারের স্থলে ক্যাবল টানতে হচ্ছে ১-২ কি.মি।  যাতে মূল লক্ষ্য শহরের সৌন্দর্য বর্ধনও ব্যহত হচ্ছে। 

ঝুলন্ত তার অপসারণ অভিযান বন্ধ না করলে ইন্টারনেট ও ক্যাবল টিভি বন্ধের হুমকী দিয়েছে সংগঠন দুটির সদস্যরা।  সংবাদ সম্মেলনে ৫ দফা দাবি জানিয়ে বলা হয়, আগামী ১৭ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আগামী ১৮ অক্টোবর রোববার থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সারা দেশে বাসা-বাড়ি, অফিস ও ব্যাংকসহ সকল পর্যায়ে ইন্টারনেট ডাটা কানেক্টিভিটি এবং ক্যাবল টিভি বন্ধ রাখার প্রতীকী কর্মসূচি পালন করা হবে। 

আইএসপিএবি ও কোয়াবের এই হুমকীর পরের দিনই গতকাল রাজধানীতে ৪টি স্পটে তার অপসারণ করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।  মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ৪৪তম দিনে নিয়মিত অবৈধ ক্যাবল সংযোগ অপসারণে অভিযান পরিচালনা করে।  দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত সদরঘাট এলাকায় অবৈধ ক্যাবল অপসারণে অভিযান পরিচালনা করেন।  মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন অভিযানে প্রায় ৯০০ মিটার অংশে অবস্থিত ইলেকট্রিক পোল হতে অবৈধ ক্যাবল অপসারণ করেন।  মোহাম্মদ কাজী ফয়সালের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৫ নং ওয়ার্ডের সাত মসজিদ রোডে অবৈধ ক্যাবল অপসারণ করেন।  একই সময়ে করপোরেশনের ফেরদৌস ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩৪ নং ওয়ার্ডের সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে আল রাজ্জাক হোটেল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মিটার অংশে অবস্থিত ইলেকট্রিক পোল হতে অবৈধ কেবল অপসারণ করেন।  এ এইচ ইরফান উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত সুত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টার অংশে রাস্তার দু›পাশে প্রায় ৬০০ মিটার অংশে হতে অবৈধ ক্যাবল অপসারণ করেন।  সব মিলিয়ে কর্পোরেশনের ৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত ইলেকট্রিক পোল হতে অবৈধ কেবল অপসারণ করেন। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিগত ১২ বছর ধরেই আইএসপি ও কোয়াবকে সরকারের পক্ষ থেকে নোটিশ দেয়া হচ্ছে, তাদেরকে নিয়ে বৈঠক করে আল্টিমেটামও দেয়া হয়েছে।  কিন্তু এসবে তারা কর্ণপাত করেনি।  আর অবৈধ তার কেটে দিতে তাদেরকে নোটিশ দিতে হবে কেন? সিটি করপোরেশন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নগরী থেকে সমস্ত জঞ্জাল অপসারণ করবে। 

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেলে সড়কে যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে তেমনি আকাশও দেখা যায়।  কিন্তু ঢাকা শহরে নিচেও যেমন ময়লা-আবর্জনা দেখা যায়, তেমনি উপরের দিকে তাকালে তারে জঞ্জাল চোখে পড়ে। 

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন প্রথমে সড়কের উপরের আবর্জনা পরিচ্ছন্ন করা শুরু করেছে।  এখন সকাল ৬টার আগেই সড়ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়।  এরপর আমরা উপরের জঞ্জাল সরাতে উদ্যোগ নিয়েছি।  আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে উপরে নিচে কোন জঞ্জাল থাকবে না। 

ফাইবার অ্যাট হোমের গভর্নমেন্ট রিলেশন্স এন্ড রেগুলেটরি বিভাগের প্রধান আব্বাস ফারুক বলেন, ফাইবার এট হোমের সারাদেশে সকল জেলা ও উপজেলায় ৫০ হাজার কিলোমিটার ফাইবার রয়েছে।  এর মধ্যে ঢাকায় ১৮শ’ কিলিমিটার ম্যাশ নেটওয়ার্ক।  আর ৬টি এলাকায় সব বিল্ডিংয়ে নেটওয়ার্ক রয়েছে।  এছাড়া গ্রাহকরা যখন যেখানে নেটওয়ার্ক চাইবে আমরা সেখানে দিতে প্রস্তুত। 

রাজধানীর সড়কগুলোর সৌন্দর্য্য বাড়াতে ১২ বছর আগে ঝুলন্ত তার অপসারণের এই উদ্যোগ নিয়েছিল টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি।  এজন্য ভূ-গর্ভস্থ কমন নেটওয়ার্ক করতে লাইসেন্স দেয়া হয় ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন্স ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের (এনটিটিএন)।  বিটিআরসির সাথে বিদ্যুৎ বিভাগ যুক্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছে।  ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ও ক্যাবল অপারেটরদের (ডিস সংযোগ প্রদানকারী) আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে বার বার।  কমিটি গঠন করে মাঝে মাঝে দু’একটি অভিযান চালিয়ে কাটা হয়েছে ঝুঁলন্ত তার।  কিন্তু সড়কগুলো আগের রূপ ফিরে পেতে সময় নেয়নি ২-৪ ঘণ্টার বেশি।  সর্বশেষ রাজধানীর ঝুলন্ত ইন্টারনেট ও ডিসের তারসহ সকল তার অপসারণের জন্য ৩০ মে পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ।  ওই সময়ের মধ্যে তার অপসারণ না করলে তার কেটে দেয়াসহ সংশ্লিষ্ট আইএসপি ও ক্যাবল অপারেটরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে কোন কিছুই কাজে আসেনি না।  সেই সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পর কোন আল্টিমেটাম না দিয়ে তার অপসারণে মাঠে নেমেছে ডিএসসিসি।