৮:০৭ এএম, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, বৃহস্পতিবার | | ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

৪ হাজার ৮৬৫ জন এপ্রিল-সেপ্টেম্বরে কোটিপতি!

১১ জানুয়ারী ২০২১, ০৬:৩৫


মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও দেশে কোটিপতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।  যা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ার পাশাপাশি ধনীদের দ্বারা সম্পদ বেশি আহরণের ইঙ্গিত দেয়।  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ১ কোটি টাকার বেশি জমা অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৮৬৫টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৪৯০টিতে।  যা এপ্রিল শেষে ছিল ৮২ হাজার ৬২৫টি।  এ সময়েই দেশে করোনাভাইরাস মহামারির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ছিল।   
 
এসব অ্যাকাউন্টে জমা অর্থের পরিমাণও সেপ্টেম্বর শেষে ৩৮ হাজার ২ কোটি টাকা বেড়ে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।  ৬ মাস আগেও এসব  অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। 
 
দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বিবেচনা করলে ১১ কোটি ২৭ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে কোটিপতি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা শূন্য দশমিক ০৭৭ শতাংশ। 
 
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এসব অ্যাকাউন্টধারীদের আমানতের পরিমাণ মোট আমানতের ৪২ শতাংশ বা ১৩ লাখ ১২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা।  অপরদিকে ১০ কোটি ৪ লাখ বা ৮৯ শতাংশ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৭৫ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা বা মোট আমানতের ৬ শতাংশ। 
 
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এটা স্পষ্টই প্রমাণ হয়েছে যে দেশে আয়ের বৈষম্য দীর্ঘকাল ধরেই বেড়েছে এবং ভাইরাসের প্রকোপ পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।  কোভিড-১৯ মন্দার কারণে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আয়ে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। 
 
একই সঙ্গে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে ধনীরা আরও ধনী হয়ে উঠেছে। 
 
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টের পরিমাণ ১ হাজার ৪৫৩টি বেড়েছে।  এসব অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ বেড়েছে ১২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। 
 
গত ১০ বছরে এসব অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার অর্থের পরিমাণ ৫ ধাপ অগ্রগতি হয়ে ৩ গুণ বেড়েছে। 
 
২০০৯ সালের মার্চ মাসে কোটি টাকার বেশি জমা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি এবং অ্যাকাউন্টগুলোতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। 
 
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের মতে, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটের কারণে দেশে দরিদ্র বেড়েছে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ।  ১ বছর আগে দেশে দরিদ্র ছিল ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। 
 
নগরের দরিদ্র অবশ্য লাফিয়ে বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। 
 
গত বছরের জুনের সমীক্ষায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ জানিয়েছিল, করোনা ভাইরাস মহামারির বিরূপ প্রভাবের কারণে ২০২০ সালে দরিদ্র বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে।  ২০১৬ সালে দেশে দরিদ্রের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। 
 
এতে আরও বলা হয়, আয়-বৈষম্য পরিমাপকারী গিনি সহগ’র হিসাবে চার বছর আগের ২০১৬ সালের তুলনায় (শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ) ২০২০ সালে আয়-বৈষম্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশে। 
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশে অব্যাহত বৈষম্য মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে গরিবরা এ সময়ের মধ্যে আরও দরিদ্র এবং ধনীরা আরও ধনী হয়ে পড়েছে। 
 
তিনি অবশ্য বলেছেন, করোনা মহামারির মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য একটি বৈশ্বিক ঘটনা।  বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে সমাজের ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ জমে প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দরিদ্ররা আয়ের ক্ষয়ক্ষতি দেখেছে। 
 
তিনি আরও বলেন, এর কারণ হলো ধনী ব্যক্তিরা প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে সমর্থন পেয়েছে এবং তাদের মধ্যে অনেকে এ অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেছে এবং দরিদ্র লোকেরা এ জাতীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। 
 
বৈষম্য কমানোর জন্য উপযুক্ত নীতিমালা না হওয়ায় দেশে বৈষম্য কমবে না বলেও তিনি মনে করেন। 
 
ড. আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, দেশের ধনী ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে কম কর দেয় এবং প্রায়শই অব্যাহতি পায়, যখন নির্দিষ্ট আয়ের গোষ্ঠীকে বেশি কর দিতে হয়।  বিশ্বব্যাপী বৈষম্য দূর করার জন্য কর ব্যবস্থার ব্যবহার করা হয়। 
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দীর্ঘকাল ধরে যে নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে তাতে বৈষম্য বাড়ছে যা প্রকৃতিগতভাবে বৈষম্যমূলক।  ফলস্বরুপ করোনা ভাইরাস মহামারি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 
 
তিনি আরও বলেন, কোটিপতি বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশে কোনো প্রাসঙ্গিক গবেষণা করা হয়নি।  মহামারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতেও কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। 
 
সাবেক ডেপুটি গর্ভনর আরও বলেন, দেশের ধনীরা আরও ধনী এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়েছে বলে গিনি সূচকে প্রতিফলিত হয়েছে। 
 
গিনি সূচকের শূন্য স্কোর নিখুঁত সাম্য, শূন্য দশমিক ৫ চরম বৈষম্য এবং ১ প্রকৃত বৈষম্যকে উপস্থাপন করে। 
 
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ বলেছেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং উচ্চতর জিডিপি বৃদ্ধিও অসমতার সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। 
 
২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৬৪ ডলার হয়েছে।   
 
জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ ছাড়াও গত ১ দশকে ৬ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।