১১:৩৭ এএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার | | ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

সিসিকে জোট ভাঙছে নাকি চ্যালেঞ্জের মুখে আওয়ামীলীগ? ..........শেখ ইমরান হুসাইন

১৭ জুলাই ২০১৮, ১০:১৭




  • উত্তাল সিলেট, উন্মুখ দেশ।  ক'দিন পরেই সিসিক নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।  ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট।  যদিও কিছুদিন পরে এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির এক অংশ ঐক্যজোট থেকে বের হয়ে যায় এবং নাজিউর রহমান মঞ্জুর একটি অংশ জোটে থেকে যায়।  এই জোট ২০০১ এর সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।  ঐক্যজোটের শাসনামলের শেষ দিকে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ১৪দলীয় জোট, মহাজোট গঠিত হয়।  এরপরে ১২র এপ্রিলে চারদলীয়জোটের পরিধি বেড়ে ১৮ দলীয় জোট হয় এবং পরে হয় ২০ দল। 
    দুই জোট থেকেই কিছু দলের জোট বদলের ঘটনা ঘটেছে।  শুরুতেই এরশাদের নাটকীয় বদল দিয়ে আরম্ভ।  ১৪ দলের বৃহৎ অংশ ১১দলের সিপিবি, বাসদ বের হয়ে গিয়েছিল।  দুই জোটেরই নেতৃত্ব দিয়েছে প্রধান দুই দল। 
    আওয়ামীলীগ ও বিএনপি একে অপরকে তুলোধোনা করেছে জোটের শরীক সম্পর্কীয় বিতর্কে। 
    তার মধ্যে প্রধান হল, আওয়ামীলীগের প্রতি এরশাদের জাতীয় পার্টির জোট নিয়ে।  এরশাদের শাসন দুদলের কাছেই ছিল কুশাসন।  অন্তত এই শাসনের বিরুদ্ধে দুইদলকে মিলে-মিশে আন্দোলন করতে হয়েছিল।  সেনাশাসনের লম্বাগলার বিরোধীতা করা আওয়ামীলীগের প্রতি তাই জেনারেল এরশাদের জোট চরম বিতর্কের কারন হয়েছে।  
    বিএনপির দিকে আওয়ামীলীগের আঙুল ছিল জামায়াতকে নিয়ে।  আঠারো দলীয় ঐক্যজোটের প্রধান শরীক জামায়াতের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিতর্কিত অবস্থানকে বিতর্কের নেয়ামক করেছে। 
    উভয়ে উভয়ের প্রতি যতই যা বলুক না কেন, এরশাদ ও জামায়াত স্ব স্ব জোটে মওজুদ ও মজবুত রয়েছে এখনও।  আওয়ামীলীগ তার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে জোটের আদর্শে পরিবর্তন এনেছে। 
    যেহেতু সব বিতর্কের পরেও জামায়াতকে জোটে রাখায় বিএনপির রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থান মোটেও নড়বড়ে হয়নি, বরং সংসদের বাইরে কোনঠাসা বিএনপির জন্য কিছু সম্ভাবনা ধরে রেখেছে।  তাই দেশের জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী রাজনীতি বা ধর্মীয় রাজনীতির গুরুত্ব মহাজোটের সচেতন নেতৃত্বের কাছে মোটেও আবছা থাকেনি।  যাইহোক, এবিষয়ে পরে লিখব।  এরপরই মহাজোট আদর্শপথে ইউটার্ণ নেয়। 
    গণফোরাম জোট থেকে বের হয়ে গেলে ১৪দলের সং্খ্যা সংকট দেখা দেয়।  সবশেষে ইসলামী ঐক্যফ্রণ্টকে যুক্ত করে গতবছর চৌদ্দ দল ষোল আনা হয়।  যেহেতু দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম বা ধর্মের প্রশ্নে দেশের মুসলিমরা ডানপন্থী ও মধ্যডানপন্থী জামাতওয়ালা জোটকেই ইতিবাচক দেখে।  সুতরাং মহাজোটের ইসলামীকরণ অনিবার্য ভাজক হয়ে পড়ে রাজনীতির ভাগ গণিতে। 
    আওয়ামীলীগ কেবল কৌশলেই নয়, খোলাখুলিভাবে বিএনপিকে বলেছে জামায়াতকে ছাড়ার জন্য।  শুধু 'বলেছে' নয় বলতে থেকেছে।  চাপ দিয়েছে রাজনৈতিক ভাবে।  সংলাপে ডেকেছে বিনা জামায়াতের শর্তে।  তারপরেও জামায়াত জোটে আছে।  এবং দুনিয়ার যে কেউ বলবে এক্ষেত্রে বিএনপির আগ্রহ শতভাগ। 
    আওয়ামীলীগ তাই একশ্রেনীর মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিজেদের জন্য বাছাই করছে।  মহাজোটের শরীকদের মধ্যেও এ-নিয়ে বিতর্ক ছিল ঢের।  আওয়ামীলীগের আদর্শিক বুদ্ধিজীবীদের অনেকে আক্ষেপ করেছেন বহু দৃশ্যে।  এই আদর্শিক সংস্কারের পর থেকে বিএনপি-জামায়াতের জোট নিয়ে আওয়ামীলীগের কার্যপরিধি সংকুচিত হয়েছে।  ভাল রাজনীতিতে এটাই হওয়া উচিৎ, এটাই সিদ্ধ। 
    বিএনপি নেত্রীর কারাবাসের পর ২০দলীয় জোটে তেমন কোন হুমকি দেখা যায়নি।  এখন আওয়ামীলীগ মোটামুটি পুরো জোটকেই প্রতিপক্ষ করে এগোতে চেষ্টা করছে।  বিএনপি জামায়াতও বাম-ইসলামী মহাজোটকে জোটগতভাবেই চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে।  সকল বৃহৎ সিদ্ধান্তে তার প্রতিফলন ঘটেছে।  গাজীপুর সিটিতে জামায়াত জোটের সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করেছে।  এমতাবস্থায় সিলেটে বিএনপি, জামায়াত ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী দিয়েছে।  এখানেই ভাঙনের ডমরু শুনছেন কেউ কেউ!
    আমি কিন্তু এখানে একটি সমঝোতা দেখি।  বিএনপি-জামায়াত জোটে সমঝোতার ধারাবাহিকতা এখানে ক্ষুন্ন হয়নি।  রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে।  সাধারণত নির্বাচনে জোটের জন্ম হয় সোজা কথায় সমঝোতার মাধ্যমে কয়েক দলের ভোট একদলের বাক্সে দিয়ে পাল্লা ভারী করতে।  কিন্তু ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষকে যখন বিজয়ের জন্য নাছোড়বান্দা মনে করা হয়, তখন সমীকরণ জটিল হতে পারে।  খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে থাকবে। 
    যদি সিসিক নির্বাচনে নৌকা পরাজিত হয় তাহলে চমক হবে নিশ্চয়ই।  তবে নৌকার জয়কেও চমকিত(!) করতে চায় ২০দল, সেজন্যই হয়ত সমঝোতার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীতে নির্বাচন!
    এখানে মহাজোটের প্রার্থীকে জিততে হলে বিএনপি ও জামায়াতের তিন প্রার্থীর ভোটের যোগফলের চেয়েও বেশি ভোট পেতে হবে।  যদি এমন হয় যে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা মিলে যে ভোট পেয়েছে তা আওয়ামীলীগের প্রার্থীর চেয়ে বেশি, তাহলে ভোটের অংকে এক এক জন প্রার্থী হিসেবে হেরে গেলেও ২০দলই রাজনীতির বাজারে বিজয়ী হবে।  এবং এটা নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি শক্ত থ্রেট হবে বটে। 
    আগেই বলেছি, যেহেতু কেসিসি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ঐক্যজোটের রয়েছে, সেহেতু বিজয়কে লুটের ছামানা ধরে ক্ষমতাসীনদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেই ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী দিয়েছে ঐক্যজোট। 
    তবে মওদুদ সাহেব যা বলেছেন, তা নিয়ে কিছু না বলাই ভাল।  আমি মনে করি এটাও ২০দলীয় জোটের পরিকল্পণার অংশ! কেননা সিসিক নির্বাচন এখন এমন হয়েছে যে, বিএনপি চাইবে জামায়াত যেন নিজেদের ভোট বৃদ্ধি করতে পারে, আবার জামায়াত চায় বিএনপি যেন নিজেদের ভোট বৃদ্ধি করতে পারে, অপরদিকে আওয়ামীলীগ চায় প্রচারণায় সুবিধা পাক জামায়াত বিএনপি দুই দলই, যাতে তারা নিজেদের ভোটের মধ্যে ভাগাভাগি করে। 
    এই নির্বাচনে আরেকটি সুবিধা পাবে জামাত-বিএনপি।  তা হল, আওয়ামীবিরোধী ভোট এবং নিজেদের স্ব স্ব দলের ভোট সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা।  জোটগতভাবে প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে যে সন্দেহ উভয়ের মধ্যে কমবেশি কাজ করে মাঝেমাঝে, তারও একটা নির্ভূল হিসেব কষা সম্ভব হতে পারে। 
    সিসিক নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোন ধারণা যোগ করবে হয়ত।  ফলাফল যাইহোক জয়-পরাজয়ের হিসেবটা আর মোটা দাগে থাকবেনা।  বিএনপি-জামায়াতের ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী দেয়ার কারনে জয়-পরাজয়ের ঘোষণা নির্বাচন কমিশনে নয়, হবে রাজনীতিতে।  জামায়াত-বিএনপির এই অভিনব সমঝোতা ঐক্যজোট, মহাজোট, প্রশাসন, কমিশন সবার প্রতি ছুড়ে দিয়েছে লক্ষ্মণরেখার চ্যালেঞ্জ!