৬:৫৬ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার | | ১৬ শা'বান ১৪৪১

Developer | ডেস্ক

সারসায় মুক্তিযুদ্ধ

‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু তালিকভুক্ত নই’

০৩ মার্চ ২০২০, ০৯:২০


ম,আ,সালাম গফফার ছন্দ

     ‘প্রারম্ভিকা’

    ১৯৭১ সালে আমি এস এস সি পরীক্ষার্থী! সারসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এস এস সি প্রথম ব্যাচের ছাত্র! এপ্রিলের ৩ তারিখে পরীক্ষা! এ কারণে প্রস্তুতিটা অনেক বেশি! পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা! পাকিস্তানের সামরিক শাসক মানবরূপী দানব ইয়াহিয়া খান ও তাঁর দোসর’রা জনগণের পাকিস্থানের নির্বাচিত ৯৯% ভাগ ভোটপ্রাপ্ত, সংখ্যা গরিষ্ঠদল আওয়ামীলীগের জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা শুরু করে! দীর্ঘ দুইমাসের বেশী কালক্ষেপণের ভিতর দিয়ে সময় পার করে।  ফলে শুরু হয় আন্দোলন মিছিল মিটিং নানা কর্মসূচী!দেখতে দেখতে এমনি অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে এলো মার্চের ২৫ তারিখ! দীর্ঘ আলোচনা চালায় পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর সাথে! পশ্চিম পাকিস্তানের ২য় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ী দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে কয়েকমাস আলোচনায় মাসের পর মাস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়! চলছে বিরতিহীন ভাবে! সংঘ্যা গরিষ্ঠদল হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান! কিন্তু বাধ সেধেছেন পাকিস্তান পিপুলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্ট! তাঁকে গোপনে গোপনে ইন্ধন দিতে থাকেন ইয়াহিয়া খান! ফলে আলোচনায় সুফল এলোনা! অমিমাংশিত অবস্থায় আলোচনা ২৫ মার্চের মধ্যরাত চলে একসময় তা ভেঙ্গে গেল! বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সঙ্গীরাও ফিরে যান বাসায়! ভুট্টোর গোঁয়ার্তুমির কারণে এত দিনের আলোচনা বলতে গেলে সব ভন্ডুল হয়ে গেল! শেষ অবদি কুচক্রি ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর চক্রান্তে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান টিক্কা খান গভির রাতে পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করে এবং নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে ।  এর পর-পরই ঘুমন্ত মানুষের উপর চালা নির্বিচারে গুলি! ২৫মার্চ রাতে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে সামরিক জান্তারা করল হত্যা!নর ঘাতকদের নারকীয় কর্ম কান্ডের মধ্য দিয়ে এক সময় রাত শেষে এলো ২৬ মার্চ! রাজধানী ঢাকা ছেড়ে নারী পুরুষ পালাতে লাগল নির্বিশেষে!

বাংলার আকাশ বাতাস বারুদের গন্ধ! বেদনায় মুহ্যমান! রাজধানী ঢাকা পাকিস্থানী  মিলিটারীর পদ ভারে প্রকম্পিত! পরিবেশ রীতিমত নৈরাজ্য বিভীশিখাময়! আমাদের একটি সিটিজেন  ট্রান্সজিস্টার ছিল।  তা জুড়তেই সহসা সাধারণ চট্টগ্রাম(কালুর ঘাট)বেতার কেন্দ্র থেকে শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ডাক! শুরু হল মুক্তি যুদ্ধ,স্বাধীনতা যুদ্ধ! পরীক্ষা দেয়া হলোনা আমার।  ৩রা এপ্রিল এস এস সি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন না করে ঝাঁপিয়ে পড়ি মুক্তি যুদ্ধে! হলাম মুক্তিযোদ্ধা।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলল নয় মাস! তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা’-বোনের মান সম্ভ্রমের ইজ্জতের বিনিময়ে অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর’১৯৭১ শত্রু মুক্ত হলো আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ! দেশ স্বাধীনের পর পারহয়ে গেছে দুই বছর।  আমি এখন কলেজের ছাত্র।  মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা হয়েছে ইতোমধ্যে।  আমার সেদিকে খেয়ালই নেই বা কোন চেষ্টাই করিনি তালিকাভূক্ত হতে।  দুঃখ নেই! কেননা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্থানী আরাগার থেকে মুক্তিপেয়ে দেশে ফিরে দেখেছিলেন আর প্রশ্ন করেছিলেন ‘সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর আটকোটি কম্বলের আমারটা গেল কোথায়’? আজ বঙ্গবন্ধুর সেই অমিয়বাণির আলোকে আমিও অসঙ্কোচে বলতে পারি, ‘আমার নামটি কই’? অনেক পরে হলেও আমি আমার ‘সারসার মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার ইতিহাস’ লিখতে কলম ধরেছি।  আমি তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা নই, তাতে কি হয়েছে! আমি তালিকাভূক্ত হতে পারিনি বা হওয়ার গৌরব স্মৃতি আমার মনের ইতিহাস থেকে কি কেও মুছে দিতে পারবে না পেরেছে? আমি মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্ত হই বা না হই তাতে কিচ্ছু এসে যায়না।  স্রষ্টার ইতিহাসে আমিত আছি।  সেখান থেকে তো আর আমার নামটি বাদ দিতে পারছেন না বা পারবেনও না।  এ ক্ষমতা কোন মানুষের নেই।  অবশেষে আমি ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে আমি আমার সারসায় মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী ইতিহাস  লেখা শুরু করেছি।  বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় কথাটিকে মাথায় রেখে।  তিনি পাকিস্তানের জেলখানায় থাকাকালীন বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর জন্য বিদেশী সাহার্য এসেছিল কম্বল আট কোটি।  কথাটি আবারও বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে সব কিছু জানার পরে বললেন, ‘সাড়ে সাতকোটি বাঙ্গালীর আটকোটি কম্বলের মধ্যে আমার টা কই’? ............ পেয়েছে সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি’।  স্মরণ কালের এই অমোঘ সত্যবাণীটি দেশের প্রথিতযশা কৃতি মণীষীগণ  সবাই জ্ঞাত।                                

 

২৬ মার্চ ১৯৭১

    ২৫ মার্চ কালো রাত্রি অতিক্রান্ত হবার পর এলো ২৬ মার্চ ১৯৭১! দেশব্যাপী চলছে অরাজক কাণ্ড! জাতি দিগ্বিদিকদিশেহারা! রাজধানী ঢাকা থেকে নির্বিশেষে নারী পুরুষ ছুটে পালাচ্ছে গ্রামের দিকে জীবন বাঁচাতে! সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে জারি করেছে সামরিক আইন মার্শাল’ল! সমগ্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে পাকিস্থানী সেনারা! ট্যাঙ্ক,কামান মর্টার ইত্যাদি সকল প্রকার মারনাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরস্ত্র, নিরীহ, নিরপরাধ বাঙ্গালীদের উপর! স্বাধীনতার ঘোষণা এলো।  এরপর থেকে স্বাধীনতার সেই  ঘোষণাটি বেতার থেকে মুহুর্মুহু প্রচারিত হচ্ছিল! ঘোষনার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ছাত্র, শিক্ষক, কামার, কুমোর, জেলে, তাতি, কৃষক শ্রমিক-সহ দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবা ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে! পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী একের পর এক ছড়িয়ে পড়ল বাংলাদেশের সকল জেলা ও থানায়! সকল ক্যান্টনমেন্ট সেনা ব্যারাক ছেড়ে।   পাকিস্তানী হানাদাররা আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমাদের যশোর ক্যান্ট্রনমেন্ট থেকে সেল, মর্টার, কামান, হেভি ম্যাসিনগান প্রভৃতিযোগে ফায়ার করতে করতে এগিয়ে আসতে থাকে ঝিকরগাছা হয়ে সারসার দিকে! মাটি কাপানো শব্দসহকারে পাকবাহিনী তান্ডবগতিতে এগুতে থাকে।  দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একটি স্বর্ণপ্রভা জেলা আমাদের এই যশোর! পাক হানাদার বাহিনি খুব দ্রুত গতিতে ঝিকরগাছা হয়ে সারসা’র নাভারণে এসেঘাঁটি গাড়ে! পরে তাঁরা বেনাপোলে আস্তানা গড়ে।  পাক হানাদার বাহিনির সেল, মর্টার নিক্ষেপ এবং শক্তিশালী কামান দাগার ভয়াবহ শব্দে যশোর বাসি ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়! চট্টগ্রাম বেতার থেকে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার সেই ঘোষনাটি পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর প্রচারিত হতে থাকে! তখনো আমরা বুঝতে পারিনি দেশে কি হচ্ছে! ঢাকা বেতারের অনুষ্ঠান শুনে আমরা যশোরবাসি তখন বুঝে উঠতে পারছিলাম না দেশের চিত্র! তবে ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে স্বাধীনতা ঘোষনা পত্রের পাঠটি যারা শুনছেন তারা বুঝতে পারছেন যে, পূর্বপাকিস্তানের কবর রচনা ঘোষণা করে পাকিস্তানী শাসক ও সেনা বাহিনির বিরুদ্ধে লড়াই বা মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! আমরা সেদিন অর্থাৎ পাকবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে ৯৯ ভাগ মানুষ সেদিন তাঁদের মূল্যবান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম সেটা ছিল অত্যন্ত ন্যায় সঙ্গত; স্বাধিকার, অধিকার আর স্বাধীনতার জন্যে।   (চলবে)