৮:৪০ এএম, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, বৃহস্পতিবার | | ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

'খুনের আসামী দিব্যি অফিস করছে এ কোন দেশ রে বাবা'!

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৫১


জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিবেশী এক যুবককে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে রাজশাহীর পিএন সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মালী সুজন আল হাসানের বিরুদ্ধে।  হত্যার দায়ে সুজন ৮৫ দিন জেলও খেটেছেন।  হত্যা মামলার আসামি সুজনের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।  এত অভিযোগের পরও দিব্যি অফিস করছেন।  আর অভিযুক্ত সুজনকে বাঁচাতে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদা আরা মরিয়া হয়ে পড়েছেন।  হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত নয় মর্মে তিনি প্রত্যয়নপত্রও দিয়েছেন।  অথচ মামলার চার্জশিটে মালী সুজন হত্যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। 

অভিযুক্ত সুজন রাজশাহী নগরীর শাহমখদুম থানার ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকার নওশাদ আলীর ছেলে।  প্রধান শিক্ষকের কাছের এক ব্যক্তির জোর সুপারিশে ২০০৪ সালের অক্টোবরে মালি হিসেবে সরকারি পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে যোগদান করে সুজন।  বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের ছত্রছায়ায় সুজন দিব্যি অফিস করেছেন।  কারাগারে অবস্থানের দিনগুলো তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে ছুটির দরখাস্ত দাখিল করেন।  এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কৌশলে তার অসুস্থতার দিন-তারিখ জানেন না বলে প্রতিবেদকে জানান।  এ ছাড়া সুজন কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তাও জানাতে ব্যর্থ হন।  তদন্ত সূত্র ধরে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ভুগরইল পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রতিবেশীদের নৃশংস হামলার শিকার হন আবদুল হান্নান ও তার ছেলে সেলিম রেজা।  এর তিন দিন পর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সেলিম।  সেলিম হত্যা ঘটনায় ওই দিনই ২১ জনকে আসামি করে শাহ মখদুম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা আবদুল হান্নান।  মামলার ৩ নম্বরে মালি সুজন আল হাসান রয়েছে।  গত ৯ এপ্রিল সুজনসহ মামলার ২১ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশ।  

অভিযোগ উঠেছে, সুজনকে বাঁচাতে স্বয়ং প্রধান শিক্ষক তৌহিদ আরা এমন প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।  প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকেও।  হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কিংবা তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো দূরের কথা তিনি দিব্যি বিদ্যালয়ে অফিস করছেন।  হত্যাকান্ডের দিন ও পর দিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুজন বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে গত ৮ আগস্ট সুজনকে দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে দাবি করেছেন প্রধান শিক্ষক।  পরে এ প্রত্যয়নপত্র থানা-পুলিশ এমনকি আদালতেও যায়। 

অভিযুক্ত সুজনের দাবি, হত্যাকান্ডের দিন বিদ্যালয়ে পঞ্চদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।  কেবল জুমার নামাজের জন্য বাইরে বেরিয়েছিলেন।  ওই হত্যাকান্ডের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করলেও মামলায় ৮৫ দিন জেল খাটার কথা স্বীকার করেছেন।  গত ১৬ জানুয়ারি কারাগার থেকে বেরিয়েই নিয়মিত অফিস করছেন সুজন। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক সেলিম রেজা বলেন, ‘মামলার তদন্তে সুজন আল হাসানের জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে।  মামলার সাক্ষীরা সুজনসহ অন্য আসামিদের সেখানে হামলা চালাতে দেখেছেন। ’ মামলার তদন্তে এসআই সেলিম রেজা গিয়েছিলেন ওই বিদ্যালয়ে।  কথা বলেন প্রধান শিক্ষক তৌহিদ আরার সঙ্গে।  অথচ হত্যা মামলার আসামির উপস্থিতি সিটি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ, রেজিস্ট্রার খাতায় সুজনের সই সব কিছুই দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রধান শিক্ষক। 

তৌহিদ আরার ভাষ্য, ‘আদালত বা থানা থেকে তাকে জানানো হয়নি।  এমনকি আদালত আমাকে কোনো ধরনের চিঠিও দেয়নি।  কোনো তথ্য না দিলে আমি জানব কীভাবে? জানি না বলেই প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি। ’

সাময়িক বরখাস্ত আইনের বিএসআর পার্ট-১ এর ৭৩নং বিধির নোট-(২) তে বলা হয়েছে- ‘ফৌজদারি অভিযোগে অথবা দেনার দায়ে জেলে আটক সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তার হওয়ার তারিখ হইতে সাময়িক বরখাস্ত বলিয়া বিবেচিত হইবেন এবং বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ ভাতা পাইবেন। ’ এমনকি আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘কোন কর্মচারী গ্রেপ্তারের পর বা আত্মসমর্পণের পর জামিনে মুক্তি লাভ করিলেও সাময়িক বরখাস্ত হিসাবে বিবেচিত হইবেন।  তবে এই ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াইবার জন্য কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্তের ফরমাল আদেশ জারি করিবেন। ’

জানতে চাইলে বিষয়টি তাদের আওতাভুক্ত নয় বলে জানান রাজশাহীর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন।  তিনি বলেন, বিষয়টি আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তরের উপপরিচালকের আওতাধীন।  তিনিই বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।  তবে নাসির উদ্দিন জানান, এমন ঘটনায় সরকারি-বেসরকারি যে কোনো ধরনের চাকরিজীবীদেরই চাকরিতে থাকার সুযোগ নেই।  এ বিষয়ে রাজশাহী আঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, ওই ব্যক্তি কারাগারে ছিলেন নাকি ছুটিতে ছিলেন বিষয়টি তার দপ্তরে জানায়নি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।