২:৫১ পিএম, ২৩ জানুয়ারী ২০২১, শনিবার | | ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

খুন-ধর্ষণ মামলার আসামিরা নতুন কৌশল বাতলে নিচ্ছেন

১১ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:৫৯


কারামুক্ত হতেই ধর্ষিতাকে বিয়ে কিংবা হত্যা মামলায় ‘আপস’ আইনের শাসনের দুর্বলতার দৃষ্টান্ত : অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে টেকসই সমাধান নয় : অধ্যাপক ড. কামরুন মোস্তফা। 

কারামুক্ত হতে নতুন কৌশল বাতলে নিচ্ছেন খুন-ধর্ষণ মামলার আসামিরা।  তারা কেউ মামলার বাদীর মাধ্যমে আদালতে ‘আপসনামা’ দাখিল করছে।  কেউ বা ধর্ষিতাকে বিয়ে করছেন।  কিন্তু এই ‘আপসনামা’ এবং ধর্ষিতাকে ‘বিয়ে’ পরবর্তী পর্যায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞ এবং সমাজ বিশ্লেষকরা। 

তাদের মতে, নিছক কারাগার থেকে মুক্ত হতেই অপরাধীরা এ কৌশল বেছে নিয়ে থাকতে পারে।  তাই বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।  এটি ভিকটিম এবং শান্তিপ্রিয় নাগরিকের জন্য নতুন ভাবনারও বিষয়।  যদিও সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে একাধিক জামিন লাভ এবং উল্টো বাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।  কিন্তু পরবর্তীতে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার ‘ঘর-সংসার’ কেমন যাচ্ছে- সেই প্রশ্ন থেকে যায়।  একইভাবে হত্যার মতো ফৌজদারি মামলায় ব্যক্তিপর্যায়ে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তারা।  এসব আইনের শাসনের দুর্বলতারই দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। 

আদালত সূত্র জানায়, গত বছর ২৭ মে ফেনীর সোনাগাজীর চর দরবেশ ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের ছেলে জহিরুল ইসলাম ওরফে জিয়াউদ্দিনের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা হয়।  ২৯ মে জিয়াউদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।  পাঁচ মাস ধরে আসামি কারাভোগ করছিলেন।  বিচারিক আদালতে জামিন চাওয়া হলে সেটি নামঞ্জুর হয়।  পরে জিয়া হাইকোর্টে জামিন প্রার্থনা করেন। 

গত ১ নভেম্বর বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ডিভিশন এই মর্মে আদেশ দেন যে, জিয়া ওই মেয়েকে বিয়ে করলে জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।  ওই আদেশের পরই ফেনী জেলা কারাগারের ফটকে গত ১৯ নভেম্বর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।  বিষয়টি হাইকোর্টকে জানালে গত ৩০ নভেম্বর শর্ত সাপেক্ষে জিয়াউদ্দিনকে এক বছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালিন জামিন দেন। 

সূত্র মতে, একই দিন প্রায় অভিন্ন ঘটনা ঘটে নাটোর আদালত চত্বরে।  ওইদিন দুপুরে ধর্ষণ মামলার আসামি মো. মানিক হোসেন বিয়ে করেন ভুক্তভোগী তরুণীকে।  মানিকের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে দিনের পর দিন ধর্ষণের অভিযোগ ছিল এজাহারে।  এ মামলায় গ্রেফতার হয় মানিক।  তার আইনজীবী মঞ্জুরুল আলম জানান, গত বছরের ১৯ অক্টোবর এক তরুণী মানিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন।  পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।  প্রথমে জামিনের আবেদন জানালে আদালত তা নামঞ্জুর করেন।  পরে বাদী ও আসামির পরিবারের মধ্যে সমঝোতা হয়।  এর ভিত্তিতে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বাদী-বিবাদীর বিয়ে পড়ানে হয়।  নাটোর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর সিরাজুল ইসলাম জানান, বিয়ের ব্যাপারে আদালতের কোনো ভ‚মিকা ছিল না।  এটি উভয়পক্ষের অভিভাবকদের বিষয়। 

পরিবার বিষয়ক কাউন্সিলর অধ্যাপক ড. কামরুন মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, পারিবারিক সমঝোতায় ধর্ষিতা আর ধর্ষকের বিয়ে হলো।  অতপর ধর্ষকের কারামুক্তি ঘটলো- এটি হয়তো ঘটনার আপাত সমাধান।  কিন্তু টেকসই সমাধান নয়।  ধর্ষক-ধর্ষিতার পরবর্তী দাম্পত্য জীবন কেমন যাচ্ছে, ধর্ষিতা ধর্ষকের পরিবারে নিগৃহ হচ্ছেন কি-না সেই তথ্য কিন্তু আমরা পাচ্ছি না।  তাই বিয়ের শর্তে ধর্ষকের জামিন লাভের পাশাপাশি পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেরও ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।  ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের পর ধর্ষিতাকে বিয়ে-এটি তার কারামুক্তির কৌশল কি-না সেটিও দেখতে হবে। 

আদালত সূত্র আরও জানায়, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারি থানার ফটিকছড়ি এলাকায় রমানন্দ্র পালিত (৬৫) খুন হন।  এ ঘটনায় তার মেয়ের স্বামী বিপ্লব খাস্তগীর বাদী হয়ে মামলা করেন।  এজাহারে আসামি করা হয় মো. ফোরকানকে।  মামলার তদন্ত পর্যায়ে তিনি গ্রেফতার হন।  ১৫ বছর ধরে মামলার বিচার চলছে।  ফোরকানও কারাগারে রয়েছেন।  সম্প্রতি বিপ্লব খাস্তগীর নিজেই ‘আপসনামা’ দাখিল করে হাইকোর্টে আসামির জামিন প্রার্থনা করেন।  জামিন আবেদনে বলা হয়, এ মামলা চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই।  ফোরকানকে জামিন দিলেও বাদীর কোনো আপত্তি নেই। 

কিন্তু বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম এবং বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের ডিভিশন আদালত গত ৪ জানুয়ারি আবেদনটি খারিজ করে দেন।  সেই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আসামির জামিনের চেষ্টা করায় বিপ্লব খাস্তগীরের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করার নির্দেশ দেয়া হয়। 

শুনানিকালে আদালত বলেন, রমানন্দ্র পালিতকে হত্যা করেছেন- মর্মে ১৬৪ ধারায় আসামির জবানবন্দি রয়েছে।  ইতোমধ্যে মামলার তিন সাক্ষী বিচারিক আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন।  ৩০২ ধারায় দায়েরকৃত কোনো মামলার আপস হতে পারে না।  কারণ এটি একটি হত্যাকান্ড।  লাশ উদ্ধার হয়েছে।  সেখানে আসামি স্বীকার করেছেন যে, তিনিই হত্যা করেছেন।  সেখানে এটি আপস হয় কি করে? পরে আদালত মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করায় বাদীর বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন। 

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পটুয়াখালী সদর থানা এলাকার সাথী আক্তার নামের এক নারী ‘খুন’ হন।  এ ঘটনায় মেয়ের বাবা জলিল দুয়ারি বাদী হয়ে মামলা করেন।  এজাহারে উল্লেখ করা হয়, স্বামী মোহাম্মদ কাউসার গাজী নির্মমভাবে হত্যা করেছেন স্ত্রী সাথীকে।  এ মামলায় গ্রেফতার হন কাউসার গাজী।  দু’বছর পর জলিল দুয়ারি গত বছরের ২২ ডিসেম্বর হাইকোর্টে জানান, তার মেয়ে সাথী আক্তার জামাইকে ভুল বুঝে এবং তার সঙ্গে রাগারাগি করে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।  কিন্তু অন্যের প্ররোচনায় জামাতার বিরুদ্ধে তিনি তখন মিথ্যা মামলা করেছিলেন। 

শুনানি শেষে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও মো. বদরুজ্জামানের ডিভিশন বেঞ্চ আসামি কাউসার গাজীকে জামিন দেন বটে।  সেই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করায় বাদী জলিল দুয়ারির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন।  একইভাবে ‘আপসনামা’ দাখিলের মাধ্যমে হত্যা মামলার আসামিকে জামিনে ছাড়িয়ে নেয়ার বিষয়টি কতটা আইনসিদ্ধ-এ প্রশ্নও তুলেছেন ডিভিশন বেঞ্চ।  বিচারকদের মতে, হত্যার মতো ফৌজদারি মামলায় ব্যক্তি পর্যায়ে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই। 

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, হত্যা মামলায় আসামির সঙ্গে বাদীর ব্যক্তি পর্যায়ে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই।  হত্যা মামলায় বাদী হয়ে যান সাক্ষী।  রাষ্ট্র বাদী হয়েই মামলা পরিচালনা করে।  সে ক্ষেত্রে বাদী যদি মিথ্যা মামলা করেছেন-মর্মে স্বীকারোক্তি দেন-এটি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য। 

অন্যদিকে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পীস ফর বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ঘটনাগুলো একই ধরণের নয়।  অনেক অপরাধী না হয়েও কারাভোগ করছেন।  মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে।  নামের মিল থাকার কারণে আসামি হচ্ছেন।  এসব আইনের শাসনের দুর্বলতারই দৃষ্টান্ত।  মামলা দায়ের এবং বিচারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই রিফর্ম হওয়া দরকার।  সেটি না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে। 

তিনি বলেন, ধর্ষণ মামলার চিত্রটি ভিন্ন।  দেখা যায়, ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসার বিষয় থাকে।  সে থেকে হয়তো পরষ্পর অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যায়।  পরবর্তীতে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রেমিকা ধর্ষণের মামলা করেন।  কারাগারে গিয়ে যদি ধর্ষক অনুধাবন করে যে সে অন্যায় করেছে এবং তখন সে ধর্ষিতাকে বিয়ে করতে সম্মত-তাহলে দু’জনের মধ্যে আপস-রফা হতেই পারে।  পরবর্তীতে তাদের সংসার টিকলো কি-না সেটি দেখার জন্যইতো অন্তর্বর্তীকালিন জামিন দেয়া হয়।