৯:০৩ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২১, বৃহস্পতিবার | | ৩ রমজান ১৪৪২

Developer | ডেস্ক

শাল্লায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার নেপথ্যে জলমহাল নিয়ে বিরোধ অন্যতম কারণ !

২০ মার্চ ২০২১, ০৭:৫৪


সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের নেপথ্যে ধর্মীয় উস্কানির চেয়ে জলমহাল নিয়ে বিরোধ অন্যতম কারণ বলে জানা যাচ্ছে।  ঘটনার দু’দিন পর থানায় মামলা, ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য ও বিভিন্ন সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। 

গত বুধবার সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।  বসতঘর ভাংচুর ও লুটপাটের পর পরিবারগুলো অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।  হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। 

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় শাল্লা থানায় দু’টি মামলা হয়েছে।  একটি মামলা দায়ের করেছেন নোয়াগাঁও গ্রমের বাসিন্দা ও হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল।  ওই মামলায় পাশের উপজেলার যুবলীগের নেতা ও প্রভাবশালী ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম ওরফে স্বাধীন মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। 

অপর দিকে পুলিশ একটি মামলা করেছে।  ওই মামলায় কারো নাম উল্লেখ না থাকলেও দু’টি মামলা নাম-পরিচয়হীন দেড় হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। 

স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, শাল্লায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার জন্য ইসলাম ধর্ম এবং হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা আল্লামা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির কথা বলা হলেও এখন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।  হামলার পেছনে রয়েছে স্বাধীন মিয়ার সাথে জলমহাল ইজারা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের গোপেন্দ্র দাস ও তার ছেলে ঝুমন দাস আপনসহ গ্রামবাসীর চলমান বিরোধ।  বিষয়টি আগেই শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন গোপেন্দ্র দাস। 

জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে ঝুমন দাস আপন ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ধর্মীয় উস্কানি ও হেফাজতে ইসলামের নেতা আল্লামা মামুনুল হককে অপমান করেছে- এমন অভিযোগ তুলে ঝুমনকে গ্রেফতারের দাবি তোলা হয়।  ওই রাতেই পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে আটক করে।  এরপর দিন বুধবার সকালে নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমনসহ অন্তত ৩০টি হিন্দু বাড়িঘরে চলে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট। 

বিষয়টি তখন নিছক ধর্মীয় কারণে বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা হলেও এখন ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে।  একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ওই হামলার নেপথ্যের রহস্য বেরিয়ে আসে।  হামলায় জড়িতরা পড়েন বিপাকে। 

স্থানীয় অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী ইউপি সদস্য স্বাধীনের সাথে ঝুমনদের পূর্ববিরোধই হামলার অন্যতম কারণ। 

জানা যায়, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার সাথে মামুনুল হক বিরোধী ফেসবুক স্ট্যাটাসের কোনো সম্পর্ক নেই।  বরং জলমহাল নিয়ে বিরোধের জের ধরেই এই অমানবিক হামলা হয়।  ওই ঘটনায় এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।  সরকারের ঊধ্বর্তন ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন।  দেশজুড়ে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড়। 

বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।  হামলাকারীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।  ওই দিন রাতেই থানায় দু’টি মামলা দায়ের হয়েছে।  এরপর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন অন্তত ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।  যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। 

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলেন দিরাই উপজেলার নাচনী গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলাম স্বাধীন ও একই গ্রামের ক্ষমতাধর আরেক ব্যক্তি পক্কন মিয়া।  নাচনী গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি স্বাধীন মিয়া স্থানীয় বরাম হাওরের কুচাখাই বিলের ইজারাদার।  জলমহাল নিয়ে স্বাধীনের সাথে কিছু দিন ধরে গ্রেফতার হওয়া ঝুমন দাসসহ নোয়াগাঁওয়ের কিছু লোকের বিরোধ চলছিল।  জলমহালে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও জলমহালের পানি শুকানোর ফলে চাষাবাদে সেচ সঙ্কটের ব্যাপারে নোয়াগাঁওয়ের হরিপদ দাস ও মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ দন্দ্র দাস শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে স্বাধীন মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন চলতি বছরের শুরুতে। 

ওই অভিযোগের পর ৮ জানুয়ারি সরেজমিনে কুচাখাই বিলে গিয়ে অবৈধ স্যালো মেশিনসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ জদ্ধ করে জলমহালের পানি ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মোক্তাদির হোসেন।  এ সময় বাঁধ কাটার কাজে সহযোগিতা করেন নোয়াগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অকিল চন্দ্র দাসের ছেলে অমর চন্দ্র দাস।  বাঁধ কেটে পানি ছেড়ে দেয়ার ওই দৃশ্য ফেসবুকে প্রচার করেন একই গ্রামের ঝুমন দাস আপন।  ওই ঘটনার পর থেকেই স্বাধীন মেম্বার নোয়াগাঁও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। 

ঝুমন দাসের বিরুদ্ধে ওই ক্ষোভের কারণে হেফাজতের অনুসারী ও তার নিজস্ব লোকদের দিয়ে বুধবার নোয়াগাঁও গ্রামে ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।  বলা হচ্ছে, মামুনুল হকের অনুসারীদের উস্কে দিয়ে তাদেরকে সামনে রেখে হিন্দুদের বাড়িঘরে তাণ্ডব চালান স্বাধীন ও তার অনুসারীরা। 

নোয়াগাঁও গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সৈলেন চন্দ্র দাস বলেন, ‘স্বাধীন ও পক্কনের নেতৃত্বে আমাদের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।  স্বাধীনের সাথে আমাদের গ্রামবাসী ঝামেলা চলে আসছিল।  তিনি বরাম হাওরের কুচাখাই বিল সেচতে শুরু করলে আমরা গ্রামবাসী তাতে বাধা দেয়।  বিল সেচার কারণে জমিতে পানি দেয়া যায় না।  পানির অভাবে জমি ও ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে।  এই বিষয়ে আমরা ইউএনও সাহেবের কাছে অভিযোগ করেছি।  অভিযোগকারী ছিলেন আমার কাকা হরিপদ দাস।  এ কারণেই হরিপদ বাবুর আত্মীয়দের বাড়িঘর বেশি ক্ষতি করা হয়েছে। ’

এমন ঘটনার নেতৃত্ব দেয়ায় স্বাধীন মেম্বারের বিচারের দাবিও করেন তিনি। 

হামলা মামলার আসামি স্বাধীন মিয়ার সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।  জানা গেছে, মামলা হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন।  পুলিশ বলছে, মামলার প্রধান আসামিসহ হামলায় জড়িত প্রত্যেককে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। 

শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক নয়া দিগন্ত জানান, হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় থানায় দু’টি মামলা হয়েছে।  একটি দায়ের করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।  এতে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।  গ্রামবাসীর পক্ষে আরেকটি মামলায় ৫০ জনের নাম উল্লেখসহ অনেক অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।  ২৪ জনকে এ পর্যন্ত আটক করা হয়েছে।  অভিযুক্ত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। 

আসামিদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হামলার মূল রহস্য জানা যাবে।  তা ছাড়া হামলার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।  পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ওই গ্রামে পুলিশ ও র‌্যাবের দু’টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান ওসি নাজমুল হক।